রুপপুর পরমাণু চুলাঃ সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

Category: Science & Technology Written by Md. Rafiqul Islam Hits: 2427

রুপপুর বাংলাদেশের পদ্মা পাড়ের একটা গ্রাম।৫০ বছর থেকে মানুষ শুনছে এখানে পরমাণু চুলা থেকে বিদ্যুৎ হবে। ৪০ বছর আগে এ চুলার বিজ্ঞানীদের ঘর বাড়ী তৈরী শুরু হলো। সবাই খুশি এই বুঝি চুলা জ্বললো, বাড়ী ঘরে সুইচ টিপ দিলেই সব ফকফকা দেখা যাবে। চুলাই তৈরী হলো না। বাড়ী ঘর তৈরী মাঝ পথে থেমে গেল। এখন পরিত্যক্ত। ৫০ বছর পর আবার শুনা যাচ্ছে নতুন করে পরমাণু চুলার কথা। রাশিয়ার সাদা চামড়ার একদল মানুষ কাজে নেমে পড়েছে। মাটি উঁচু হচ্ছে, ছোট খাটো দালান কোঠা নতুন করে তৈরী হচ্ছে।

ছোট বেলায় দেখতাম মা চাচিরা কাদামাটি দিয়ে মাটির চুলা তৈরী করতেন। সাইন্স ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা বললেন, এ চুলা ভাল নয়, পরিবেশ দূষণ হয়। অনেক কাঠ অপচয় হয়। তারা আনলেন  উন্নত মানের মাটির চুলা। মায়ের মাটির চুলা এখনও আছে। অনেক বাড়িতে  সাইন্স ল্যাবরেটরির উন্নত চুলাও বসেছে।

গ্রাম ছেড়ে শহরে আসলাম। ঘরের মধ্যেই রান্না, থাকা খাওয়া। মাটির চুলা এখানে চলে না, তাই কেরোসিনের চুলা, ইলেকট্রিকের চুলা, গ্যাসের চুলা। এত দিন জানতাম বিদ্যুৎ দিয়ে চুলা জ্বলে, এখন শুনছি চুলা থেকে বিদ্যুৎ হবে। আবার এ চুলা কয়লা, কেরোসিনের চুলা নয়। এ চুলা পরমাণু চুলা। এখানে জ্বলবে পরমাণু, তৈরী হবে তাপ। তাপে পানি বাষ্প করে তা দিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরী হবে। কাঠ, কয়লা পুড়ে, তৈরী হয় কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস, তাপ –আর পড়ে থাকে ছাই। ছাই আর কিছু নয়; না পোড়া কার্বন। চুলা পরিষ্কার করে ছাই গুলো একটা গর্তে জমা করে রাখা হতো। চৈত্র মাসে এই ছাইগুলো মাঠে নিয়ে গিয়ে জমিতে ছিটানো হতো। ছাই জমিতে দিলে ধান গম ভালো হয়। শহরের লোকজনের মাছ কুটার জন্য ছাই দরকার হলেও ঘরে চুলোর ছাই দরকার নাই। তাই এদের জন্য তেল,গ্যাসের চুলাই ভালো।
বিজ্ঞানীরা বলছেন পরমাণু চুলায় কাঠ, কয়লা,তেল না- পরমাণু পুড়বে। পরমাণু পুড়ার জন্য কোন অক্সিজেন দরকার হবে না। এ কেমন কথা। পুড়বে কিন্তু অক্সিজেন দরকার হবে না। এ কেমন পোড়া। আসলে পুড়বে না পরমানু ভাঙবে। পরমাণু ভেঙ্গে হবে গতিশক্তি, গামা রশ্মি বিকিরণ, নিউট্রন, পরে তৈরী হবে অন্য পরমাণু। গতিশক্তি পাশের একটা পরমাণুকে আঘাৎ করবে, তাই তৈরী হবে তাপ। যে পাত্রে এ সব কাণ্ড ঘটবে তার দেয়াল গামা রশ্মি শুষে নিয়ে তৈরী হবে তাপ। এই তাপ দিয়ে পানি ফুটিয়ে বাষ্প তৈরী করে তা দিয়ে ঘুরানো হবে টারবাইন;জেনারেটর তৈরী করবে বিদ্যুৎ।

পৃথিবীর ৩০ টি দেশে পরমাণু ভেংগে বিদ্যুৎ তৈরী করছে। আমরাও এ কাজ করবো। রুপপুরে এ সব কাণ্ড কারখানা হবে।, ভাবতে অবাক লাগে। পরমাণু ভাংগতে এমন কি লাগে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, সব পরমাণু ভাংগে না, আমরা এখনও ভাংগতে শিখিনি।  পরমাণু ভাংগতে দরকার নিউট্রন, নিউট্রন এর সন্ধান আমরা পেলাম ১৯৩২ সালে। হাঙ্গেরিয়ান বিজ্ঞানী ১৯৩৩ সালে বললেন, নিউট্রন দিয়ে পরমাণুকে আঘাত করলে পরমাণু ভেংগে বাহির হবে তাপ। প্রক্রিয়াটার নাম দেয়া হলো নিউক্লিয়ার ফিউশন। কিন্তু পরমাণু ভাংগার কাজটা করা গেল না সংগে সংগে, কারন ভাংগার যন্ত্রটি কাজ করলো না। তবে ভাংগার যন্ত্রটির নাম দেয়া হল রিএ্যাকটর। ১৯৩৮ সালে কাজটি করলেন লিসে মিটনার,ফ্রিটস  স্টাসম্যান এবং অটোহান যৌথ ভাবে। তারা ইউরেনিয়ামের উপর নিউট্রন দিয়ে আঘাৎ করে ভেংগে ফেললেন ইউরেনিয়াম পরমাণুকে। ১৯৩৯ সালে তারা লক্ষ্য করলেন ভাংগার সময় বেশ কয়েকটি নিউট্রন বাহির হয়েছে। যা আবার আঘাৎ করবে অন্য পরমাণুকে। এ ভাবে ভাংগা ভাংগি লেগে যাবে যার নাম নিউক্লিয়ার চেইন রিএ্যাকশন। চেইন রিএ্যাকশনে যে তাপ আর রেডিও এ্যাকটিভিটি তৈরী হয় তাতে সব কিছু গলে যায়, আশে পাশের সব কিছু আয়োনাইজড হয়ে যায়। যুদ্ধে পরমাণু বোমা তৈরীতেও কাজে লাগে এই প্রযুক্তি। যার প্রয়োগ ঘটে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে।

মাঝে দু একটা পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরী হলেও তা ছিল মিলিটারির জন্য। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আইজেন হাওয়ার ১৯৫৩ সালে ঘোষণা দিলেন ‘ এটম ফর পিস’ । সাধারণের উপকারে ১৯৫৪ সালে প্রথম পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরী হলো “রাশিয়ার অবোনিক্স নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট”। রাশিয়া আমেরিকা ১৯৫৪ সাল থেকে পরমাণু ভাংগা তাপ দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরী করছে। আমরা ৫০ বছর ধরে চেষ্টা করছি। পারছিনা কেন? অনেক দিন থেকেই তো আমরাও কয়লা পুড়িয়ে বাষ্প তৈরী করে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ তৈরী করছি। পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রও তো একই কাজ করবে। এ এমন কি কঠিন কাজ।

পরমাণু চুলার সবচেয়ে বড় জটিল অংশ পরমাণু ভাংগা। এ কাজটি যে পাত্রে করা হয় তার নামই  রিএ্যাকটর ভেসেল। সিলিনডিক্যাল একটা পাত্র। এখানে থাকে পরিশোধিত ইউরেনিয়াম -২৩৫। ছোট ছোট ট্যাবলেট এর মত করে তা একটা ফাঁপা রডের মধ্যে একটার পর একটা বসিয়ে মূল ফুয়েল রড তৈরী হয়। এখানেই নিউট্রন আঘাত  করে। ইউরেনিয়াম তা শুষে নিয়ে তৈরী হয় ইউরেনিয়াম-২৩৬,যা ভেংগে যায়। পরে চলতে থাকে চেইন রিএ্যাকশন। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সব কিছু গলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। ছড়িয়ে পরবে রেডিয়েশন। সাফ হয়ে যাবে জীবকুল। মূল সমস্যা এ সব সামাল দেয়া। নিউট্রন এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা; তাপ কমান। রেডিয়েশন বাহিরে যেন না আসে তার ব্যবস্থা করা।

পৃথিবীর কিছু ধাতু বা ধাতু-শংকর আছে যা অতিরিক্ত নিউট্রন শুষে নেয়। এ ধাতু-শংকর দিয়ে নিউট্রন শুষে নিয়ে চেইন রিএ্যাকশন নিয়ন্ত্রণ এমন কি একে বারে বন্ধ করে দেয়া যায়। রিএ্যাকটরের মধ্যে এ ধাতুর প্রবেশ কম বেশী করে চেইন রিএ্যাকশন নিয়ন্ত্রণ করতে এক্সানন রড ব্যাবহার করা হচ্ছে। রিএ্যাকটর পাত্রটিতে পানি ভর্তি করে রাখা হলে তাপ শুষে বাষ্প হয়ে যাবে। তা বাহিরে এনে টারবাইন ঘোরানো যাবে। রিএ্যাকটরের তাপও নিয়ন্ত্রিত হবে। নিউট্রন শোষক রড গুলোর নাম দেয়া হয়েছে নিউট্রন এ্যাবজরবেন্ট। এ প্রযুক্তির অসুবিধা হলো বাষ্পের সাথে রেডিও একটিভিটি টারবাইন পর্যন্ত ছড়িয়ে পরে। এ প্রযুক্তির নাম দেয়া হয়েছে বয়েলিং ওয়াটার রিএ্যাকটর। চেরনোবিলে যে রিএ্যাকটরটা দুর্ঘটনা কবলিত হয়েছিল ওটা ছিল এধরনের একটি। এ ছাড়াও রিএ্যাকটর ভেসেলটির বাহিরে আলাদা কোন সিমেন্টের প্রাচীর ছিল না। তাই ভয়াবহতা ছিল প্রখর।

পানি স্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলীয় চাপে ১০০ডিগ্রীসে. এ বাষ্প হলেও চাপ বেশী হলে অনেক বেশী তাপেও বাষ্প হয়না। চাপ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের চেয়ে ১৫ গুন বাড়ালে পানি ২২০-৩০০ ডিগ্রী সেলসিয়াসেও তরল থাকে। রিএ্যাকটরে থেকে পানি বিশেষ টিউব দিয়ে বাহির করে অন্য ট্যাঙ্কির পানির মধ্যে প্রবাহিত করা হলে পানি বাষ্প হবে। এ বাষ্পে কোন রেডিও এ্যাকটিভিটি থাকবে না। রেডিও এ্যাকটিভিটি ছড়াবে না। এ বাষ্প দিয়ে টারবাইন ঘোরানোও যাবে। এ ধরনের রিএ্যাকটরের নাম দেয়া হয়েছে প্রেসারাইজড ওয়াটার রিএ্যাকটর।

প্রাথমিক পর্যায়ের ছোট ছোট গবেষণাধর্মী রিএ্যাকটর গুলোকে বলা হচ্ছে ১ম; ফুটানো পানি ব্যবহারকারী রিএ্যাকটরকে ২য় এবং চাপযুক্ত পানি ব্যবহারকারী রিএ্যাকটর ৩য় জেনারেশন হিসাবে পরিচিতি লাভ  করেছে। এর সংগে যোগ হয়েছে এক বা একাধিক কংক্রিটের মোটা দেয়ালের কনটেইমেন্ট;নতুন ফুয়েল টেকনোলজি; প্যাসিভ সেফটি ব্যবস্থাপনা। ৩য় জেনারেশনের রিএ্যাকটর গুলিতে সর্বশেষ সংযোজন কোর ক্যাচার। চেইন রিএ্যাকশন নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেলে রিএ্যাকটর ভেসেল গলতে শুরু করলে, রিএ্যাকটরটি নিচে গর্তে পড়ে যাবে সংগে সংগে উপর থেকে ডেবে যাবে, ঠাণ্ডা করার জন্য শুরু হবে পানি প্রবাহ। এটাই কোর ক্যাচার প্রযুক্তি। কোন তেজস্ক্রিয়তা ছড়াবে না।

৪র্থ  জেনারেশন এর রিএ্যাকটরের কথা শোনা যাচ্ছে। এ গুলো মূলত গবেষণা পর্যায়ে আছে। ২০৩০ সালের আগে এ গুলোর দেখা মিলবে না। এ গুলো হবে উচ্চ তাপের রিএ্যাকটর। ঠাণ্ডা করার জন্য গলিত লবন বা হিলিয়াম ব্যবহার হবে।

এসব গবেষণা নিয়ে ভেবে লাভ নাই। আমরা রুপপুরে পারমাণবিক চুলা থেকে বিদ্যুৎ তৈরী করতে চাই। আমাদের এখানে চেরনোবিল, ফুকুশিমার মত ঘটনা যেন না ঘটে। এটাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ সরকার রাশিয়ান ফেডারেশনের সাথে চুক্তি করেছে। রাশিয়ান ফেডারেশন কথা দিয়েছে সর্বশেষ প্রযুক্তির রিএ্যাকটর তারা সরবরাহ করবে। বসবে দুটি ভিভিইআর-১০০০ রিএ্যাকটর। সেখান থেকে ২০০০ মেগা ওয়াট বিদ্যুৎ তৈরী হবে। ভিভিইআর কি আনেকেই আমরা জানি না। ‘ভিভিইআর’ রাশিয়ান ভাষার শব্দের সংক্ষিপ্ত রুপ। ভোদো ভোদিয়াননয়ই ইনারগেটিচিসকি রিএ্যাকটর- সার বাংলা দাড়ায় ‘ পানি-পানির শক্তি রিএ্যাকটর’। এটা প্রেসারাইজড ওয়াটার রিএ্যাকটর। এর সাথে যুক্ত করা আছে কোর ক্যাচার। ফলে এটা প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেকটাই নিরাপদ।

রিএ্যাকটরের জ্বালানী রড গুলো ১৯ মাস পর নিঃশেষ হয়ে যায়। এ কারনে রুপপুরে জ্বালানী রডের মজুদ, নিঃশেষিত জ্বালানী যাকে জেট ফুয়েল বলা হয় তা সংরক্ষণ, পরে একটা সময় পার হলে সে গুলো পরিবহন সবকিছুই জটিল এবং বিপদ সংকুল কাজ। পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি গুলো আকারে বিশাল। এগুলোকে পরিবহন করার অভিজ্ঞতা আমাদের নাই। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করার মত জনবল আমাদের নাই। যাদের উপর নির্ভর করে এ প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার।

আমাদের একটা পারমানবিক গবেষণা চুল্লি রয়েছে। ২ মেগা ওয়াট চুল্লিটি আমেরিকার তৈরী; ৩০ বছরের পুরনো। অনেকে সেখানে কাজ করেছেন। দেশের বাহিরে পরমাণু চুলা নিয়ে কাজ করা পুরনো কিছু বিজ্ঞানী রয়েছেন। তাঁদের ১ম ও ২য় জেনারেশন রিএ্যাকটরে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। পরমাণু শক্তির সাথে বাংলাদেশের মানুষের পরিচয় হয়নি। তাঁরা শুধু জানে পরমাণু বোমায় হিরোশিমা নাগাসাকিতে ঘটে যাওয়া বিভিষিকার কথা। তারা দেখেছে ১৯৮৬ সালে চেরনোবিল,তারপর ফুকুশিমায় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার ছবি। তারা যানে না পরমাণু চুলা,পরমাণু বোমা নয়। চুলায় বোমার মত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার হয় না। চাইলেও এখানে বোমার মত তাপ তৈরী করা যায় না। ৩য় জেনারেশনের পরমাণু চুলা গুলো ১ম ও ২য় জেনারেশনের মত প্রযুক্তি দিয়ে তৈরী নয়। তবুও ভয় হয়। আমরা পারব কি সব বাধা ডিঙ্গিয়ে রুপপুর পারমানবিক চুলা থেকে বিদ্যুৎ তৈরী করতে?