আমার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

Category: Science & Technology Written by Md. Rafiqul Islam Hits: 2974

 

আমার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

লালমাটির মানুষইলামিত্রের বিদ্রোহের আগুন দগদগ করে জ্বলে আমার বুকে; ল্যাংড়া, ফজলীর রসালো স্বাদ লেগে থাকে আমার মুখে; সুযোগ পেলেই ছুটে আসি আমি আমারি মাঝে

বাবার হাত ধরে রাজশাহী ঘুরছিবাবা বলছেন;

এটা রাজশাহী কলেজ, এটা মিউনিসিপ্যালিটি, ওটা মেডিক্যাল কলেজ, ওটা ইঞ্জিনিয়ারিং, এটা হলো রাজশাহী ইউনিভারসিটি

বাবা টমটমওয়ালাকে বললেন, টমটম ঘোরাওজিজ্ঞাসা করলাম,

-রাজশাহীতে আর কিছু নাই? বাবা জানালেন,

-আছে, এখান থেকে আর একটু আগে হরিয়ানা সুগার মিল, একটা রেল স্টেশনও আছেরেলে ফিরবো, তখন দেখতে পাবি

টিলার খাঁজে খাঁজে জুমচাষের মত থাক থাক ধানের সারিএটাই ছিল আমার দেখা রাজশাহী, আমার ছোট বেলা

তখন কৃষকের মুখে মুখে ঘুরতো খনাবাবা খনার একটি চটি সংগ্রহ করে তার কাঠের সিন্দুকে স্বযত্নে রাখতেনমাঝে মাঝে চটি বইটি বাহির করে পড়তেন

ইউনুস চাচা, আমাদের জমি আদিতে চাষ করতেনসন্ধ্যায় বাবার অনুমতি নিতে এসেছেন,

-তুফানী ভাইদুই হাল দিয়্যাছিমাটি খুব ভালোক্যাল বিছন ছিটিয়া দি?

বাবা কোন জবাব না দিয়ে দৌড় দিয়ে ঘর থেকে খনাকে বের করে আনলেনপড়ছেন;

ষোল চাষে তুলা, তার অর্ধেকে মুলা,

তার অর্ধেক এ ধান, বিনা চাষে পান

বাবার চেহারা পালটাচ্ছেহঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন;

ইউনুস কি বুললি, দুহাল দিয়া ধান বুনবি? ইউনুস চাচা হতবাক হয়ে তাঁর অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন,

-বুনলে কি হবে? মাটি তো ভালো আছে বাবা আরও ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন;

- তোর কথা আমি শুনবোনা; খনা যা বলেছে তাই কর

ইউনুস চাচা কোন কথা না বলে চলে গেলেনআরও কয়েকদিন পর আরও দুহাল দিয়ে বিছন ছিটানো হলোধান কাটার সময় ইউনুস চাচা বললেন;

-তুফানী ভাই, ভুঁই এ এইব্যার ধান ভালো হয়েছে

বাবা কোন জবাব না দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন

অনেক দিন বৃষ্টি নাইরাস্তায় হাটু ধুলা, মাঘ পার হয়ে ফাগুনের মাঝা-মাঝি, বাবা সন্ধ্যায় ইজি চেয়ার নিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে থাকেনচাঁদের চারদিক ঘিরে বলয় তৈরী হয়বাবা নিজে নিজে বলতে থাকেন,

-হবে, হবে

কি হবে বুঝতে পারি না, বাবাকে জিজ্ঞাসা করতে ভয় পাইবাবার পাগলামী দেখে একদিন জিজ্ঞাসা করেই বসলাম,

-তোমার কি হয়েছে? এমন পাগলামো করছেন কেন?

জবাবে বাবা বললেন:

খনা বলেছে;

যদি বর্ষে মাঘের শেষ

ধন্য রাজার পূণ্যি দেশ

আরো বলেছেন,

যদি বর্ষে ফাগুনে

রাজা যায় মাগনে

এখন ফাগুনের শেষ; এখন বৃষ্টি হলে রাজা যাবে মাগনে, তা হলে আমাদের কি হবে?

কিছুই বুঝলাম না, চুপ করে রইলামবুঝলাম মংগা শব্দটি কোথা থেকে এসেছে

বাবা বলছেন;

যদি ফাগুনেও বৃষ্টি না হয় তা হলে কি হবে,

খনা তো কিছু বলে যায় নিআমরা কি করব?

প্রকৃতির অসহায় কিট হিসাবে বাবাকে দেখে আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করেছিল,

-আমাদের একটা খনা দাওএকটা খনা দরকারতখন বুঝিনি খনা আর কেউ না, খনা বিজ্ঞানী, আমাদের সমাজ ব্যবস্থা তাঁকে লালন করেনি, তাঁকে সবকিছু বলে যাওয়ারও সুযোগ দেয়নিআমরা তাকে খুন করেছি

বাবার দূর্বলতাটা আমাকেও পেয়ে বসেছিলসুযোগ পেলেই চুরি করে বাবার খনার চটিটি পড়তামএকটা ছড়া আজও মনে আছে:

কলা রুয়ে না কেটো পাত

তাতেই কাপড় তাতেই ভাত

অনেক দিন মনে ছিল না খনাকেপেয়ে বসেছিল নিহারঞ্জন, কুয়াশা, মাসুদ রানা এ সবযখন মনে পড়লো খনাকে, বাবা বিদায় নিয়েছেখনাকে খুজলামপেলাম না কোথায়অভিমান করে চলে গেছে

আগের পড়া শ্লোকগুলো মনে করার চেষ্টা করলাম,

আবছা আবছা মনে পড়লো:

মাঘের আট ফাগুনে আট

ফুটলে ফুটলো না ফুটলে শুকান কাঠ

৮ ফাল্গুন আম গাছে মুকুল না দেখলে আত্মা শুকিয়ে যেতোপ্রিয় পাঠক শ্লোকগুলো স্মৃতি থেকে বলছিভুল হলে ক্ষমা করে দিবেন

প্রকৃতির রুপ-রস-গন্ধ ছেড়ে রাজনীতি নিয়ে মেতে উঠলামমনে মনে শপথ নিলাম, রাজনীতি দিয়ে সব কিছু পালটিয়ে দিবো

বুকে সুকান্ত, মুখে নজরুল;

রানার, রানার, এ বোঝা টানার দিন শেষ হবে কবে

আবার নতুন সূর্য্য উঠবে কবে

রাজনীতি পালটিয়ে রানারকে বাঁচাতে হবেভাবনার সাথে বড় ভাইদের গর্জন

বিপ্লবী বড় ভাইয়েরা বলছেন, এভাবে হবে নারাজা বদলাতে হবেবড় ভাইদের সুর ধরে স্লোগান দিতে শুরু করলাম

লাথি মার ভাংগরে তালা

জ্বালা সব বন্দি শালায় আগুন জ্বালা আগুন জ্বালা

বাংগালী লাথি মারছে, একের পর এক তালা ভাংছেআংরেজ সাহেবদের বন্দিশালা ছাই হয়ে গেলোআমরা রয়ে গেলাম তিমিরেইআমাদের অজ্ঞাতে তৈরী হয়েছে পাকিস্তানী বন্দিশালাপাকিস্তান সৃষ্টির দিন ১৯৪৭ সাল থেকেই শুরু হলো লাথি মারাগর্জে উঠলো বাংলাদেশআঘাতে, আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল পাকিস্তানী বন্দিশালাযুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ, আকাশ-চুম্বি প্রত্যাশা, পূরণের পথ নাইআমরা অপেক্ষা করতে পারলাম নাশুরু হলো লাথি মারাবঙ্গবন্ধু ঘাতকদল তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করলোতিনি রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দানে সত্যটা উম্মোচন করে গেলেন:

তোমরা যদি তোমাদের কাজ না কর, আমি তোমাদের কিছুই দেবার পারুম না

বুঝলাম, শাসন ব্যবস্থা সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে পারেনিজেরটা নিজেদেরকেই করতে হবে

কষ্টটা পাথরের মত বুকে চাপা রইলমানুষগুলো আগের মতই রয়ে গেছেতাঁরা মনে করছেন সরকার তাদের সব কিছু করে দিবেসবার মুখে একটাই কথা:

-কি পেলাম?

-আমার কম্বল কোথায়?

-আমরা কি খাবো?

মানুষ মনে করেছে সরকারের কাছে সব কিছু আছে, তাঁরা তা আঁকড়ে ধরে আছেগুটি কয়েক মানুষ লুটে পুটে খাচ্ছেতাঁরা শ্রেণীর শত্রু, তাঁদের সব কিছু কেড়ে নিতে হবে, সরকারকে হটাতে হবে, শ্রেণী শত্রু খতম করতে হবেএরা সব কিছু সরকার দিয়ে পালটাতে চানখেটে খাওয়া মানুষ রাজনীতি বুঝে নাডাল ভাতের আশায় খনা বেশী করে আকড়ে ধরলো

কেউ খনার বাহিরে আসতে পারলো নাফাগুনে বর্ষণ হলে রাজা কেন যাবে মাগনে? এর কি কোন বিকল্প নাই? এর জন্য কি করা দরকারফাগুনে বর্ষণ হলে আমের মুকুল পুড়ে যাবে, আম চাষীর মাথায় বাজ পড়বে কেন? আমরা কি সারা বছর আম ফলাতে পারি না? বিজ্ঞানীরা তা করতে পারেন, করেন নি

আমাদের অনেক পরে ভিয়েতনাম স্বাধীন হয়েছেনভেম্বর মাসে ঢাকার বাজারে আম দেখে অবাক হলামবাক্সগুলো দেখে অবাক হলাম, ভিয়েতনাম থেকে আমদানী করাভিয়েতনামের আমগাছে সারা বছর আম ধরেখনাকে কাঁচকলা দেখিয়ে তারা বলছে,

এক পথ বন্ধ হলে দশপথ খুলে যায়শুধু পথগুলো খুজে নিতে হবেভিয়েতনাম পথগুলো খুজে পেয়েছেআমরা পথগুলো খোজার চেষ্টা করিনিআশির দশকে ব্রাক নরসিংদীর মনোহরপুরে শ্যালো-ডিপটিউবওয়েল দিয়ে সেচ দিচ্ছেখরাকে তারা হার মানিয়েছে, চাষীদের ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেসেচের কমিশন ব্রাককে নতুন মাত্রায় নিয়ে এলোমানুষ বলছে:

-সরকারকে দিয়ে কিছু হবে না

-এনজিওরাই মানুষের ভাগ্যের চাকা পরিবর্তন করবে

আশির দশক বিদেশী এনজিওর পাশাপাশি ব্যাঙের ছাতার মত দেশী এনজিও গজিয়ে উঠলোএনজিওর ভিড়ে সরকারের অস্তিত্ব নজরে পড়ে নাবিদেশী সংস্থা দুহাত খুলে এনজিওদের টাকা দিচ্ছে, শহরগুলোতে এনজিও টাওয়ারগুলো স্বগর্বে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে

কাজের সুত্রে ঘিওরের কৃষি কর্মকর্তা আলাপ করতে আসলেননামটা আজ আর মনে নাইতাঁকে বললাম;

-যেভাবে মানুষ বাড়ছে , আপনারা তাঁদের মুখে খাবার তুলে দিবেন কিভাবে?

প্রস্তাব রাখলেন,

-স্যার, পানি, সার, আর বীজ এই তিনটি নিশ্চিত করতে পারলেই উৎপাদন তিনগুন করা যায় জিজ্ঞাসা করলাম,

নিশ্চিত করতে পারলে উৎপাদন তিনগুন হবেকিন্তু কিভাবে? বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? কৃষি কর্মকর্তা প্রতিক্রিয়াহীন ভাবে জবাব দিলেন,

-স্যার, এটা তো আপনাদের কাজ

এটা ম্যানেজমেন্টের কাজ জানি ম্যানেজমেন্ট করবে, হয়তো বা করবে নানা করলে কৃষক নিজেই করে নিবেনকৃষি বিজ্ঞানী হিসাবে আপনাদেরও তো অনেক কিছু করার আছেআপনারা না করলে কৃষক কি এটা পারবে?

কৃষিবিদ হতাশার সুরে বললেন,

আর কি করবো স্যারকৃষকদের তো নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম;

-নতুন একটা কিছু করেন আমার কথাশুনে অবাক হয়ে বললেন,

-কি করতে বলছেন! স্যার

ঘিওরে রাস্তার ধারে শত শত কুল গাছ আছেএ কুল গাছগুলোকে বাডিং করে উন্নত কুল গাছ তৈরী করেনঘিওরের লোকের চেহারা পাল্টে যাবে তাঁকে পরামর্শ দিলাম

কৃষিবিদ নিজ উদ্যোগে ঘিওরে কাজটি করেছেনপরে ঘিওরের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলামগাছগুলোয় থোকা থোকা বড় বড় কুল দেখে স্বস্তি পেলাম

লাল মাটির মানুষ, আমার আমের নেশা অনেকটা হিরোইনের নেশার মতইনিজেকে সামাল দিতে পারি নাফল ছাড়া একদিন কাটবে আগে ভাবতে পারতাম নাএখন ফল দেখলে ভয় পাইসব ফলে ফরমালিনফল খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিম্যাজিস্ট্রেট রোকনুদ্দৌলা ফরমালিন মাখানো ফল জব্দ করছেনব্যবসায়ীকে জেল খানায় ঢুকাচ্ছেনটনকে টন ফল মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হচ্ছেকিন্তু ফরমালিন মিশানো বন্ধ হচ্ছে নাবাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের চেয়ারম্যানকে বললাম:

স্যার বিজ্ঞানীরা ফরমালিন আবিষ্কার করে পৃথিবীকে অনেক কিছু দিয়েছেনআমরা আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞফরমালিনের অপব্যবহারে আমরা আজও আতংকিতআমরা ফল খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি

চেয়ারম্যান সাহেব গর্ব ভরে বললেন:

স্যার শুনে খুশি হবেনআমাদের বিজ্ঞানীরা ফরমালিন সনাক্তকরণ কিট উদ্ভাবন করেছেনদামে সস্তা, যে কোন লোক তা ব্যবহার করতে পারবেন

অবাক হয়ে বললাম:

ঐ কিট দিয়ে কি করবো? আরও ফলমূল মাটিতে মিশানো হবেআরো লোক জেল খাটবেপুরোদেশ জেলখানা হবেএটা কি সম্ভব?

চেয়ারম্যান সাহেব আরো অবাক হয়ে বললেন:

-স্যার আমরা এত কমদামী একটা কিট তৈরী করলামআর আপনি এ ভাবে বলছেন?

-বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কারের জন্য ধন্যবাদচেয়েছিলাম, চোর যেন চুরি না করে তার পথ খুঁজে বাহির করতেবিজ্ঞানীরা চোর ধরার যন্ত্র তৈরী করে দিলেন, জবাব দিলাম

জবাবে চেয়ারম্যান সাহেব বললেন:

-স্যার বুঝলাম না

আপনারা বিজ্ঞানীরা আমাদের এমন একটা কিছু দেন যা ফরমালিনের বিকল্প হিসাবে কাজ করবেদাম ফরমালিনের চেয়ে কমজনস্বাস্থ্যের কোন ক্ষতি হবে নাদুনিয়া ন্যানো টেকনোলজি নিয়ে ভাবছেদেখুননা এটা দিয়ে কিছু করা যায় কিনা? জবাব দিলাম

চেয়ারম্যান স্যারের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলোতাঁর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া;

-বুঝেছি স্যারবিজ্ঞানীদের বলবোআমাদের একটা কিছু করতে হবে

সুকান্ত শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন করে রানারের দু:খ-কষ্ট লাঘব করতে চেয়েছিলেনরাশিয়ার সমাজতন্ত্র বিশ্বে নতুন আশার আলো জ্বেলেছিলরানারের দু:খ লাঘব হয়নিপ্রযুক্তির উন্নয়নে রানারের সে চেহারা আজ আর চোখে পড়ে নাডাকহরকরার গল্প আজকের প্রজন্মকে তেমন আকর্ষণ করে নাএকটি মুঠোফোন ডাকঘরকেই জাদুঘরে পাঠিয়ে দিয়েছেপ্রযুক্তির এই সুনামীকে অনেকে আজও বুকে দিতে পারেনিতাঁরা বলছেন,

-এ সব লোক কোথায় যাবে? এদের কি হবে?

একটি পথ বন্ধ হয়েছেদশটি নতুন পথ খুলেছেমানুষগুলোকে নতুন পথ দেখিয়ে দিনপ্রযুক্তি বিমুখ করবেন নাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এনে দিবে মুক্তিআজকে আমাদের দরকার নতুন খনার, আপনারাই আমাদের নতুন খনা

-----------xx---------------