ট্রেনীর শত জিজ্ঞাসা : ট্রেনারের প্রস্ত্ততি

Category: Interview Written by Md. Rafiqul Islam Hits: 6379

প্রশিক্ষণার্থীদের শত শত জিজ্ঞাসা আছে, এটা থাকবেই। এ জন্য ট্রেনারের প্রস্ত্ততি থাকা প্রয়োজন। জিজ্ঞাসাগুলো সব সময় ট্রেনিং/প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত হবে তা নাও হতে পারে। ট্রেনার হিসাবে আপনাকে সিদ্ধান্ত দিতে হবে কোন প্রশ্নের জবাব তিনি কিভাবে দিবেন। প্রসংগিক বিষয়ে জবাব দিতে গিয়ে আমরা অনেক সময় খৈই হারিয়ে ফেলি। ট্রেনারের জন্য এটা মাঝ সাগরে জাহাজ ডুবির অবস্থা। ফিরে আসার কোন উপায় থাকে না।

 

মনে রাখতে হবে ট্রেনারকে প্রাসংগিক সরাসরি সম্পৃক্ত সকল প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। তা না হলে ট্রেনার ট্রেনীদের আস্থা হারাবে। ট্রেনীরাও প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাবে তাঁদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হবে। ব্যর্থতার দায়ভার ট্রেনার এড়াতে পারে না। তাই ট্রেনারের বিষয়বস্ত্তর উপর ভালো দখল অর্জন করতে হবে। আমাদের ট্রেনিং এর মূল বিষয় ‘‘ভোট বৃত্তান্ত’’। ‘‘ভোট বৃত্তান্ত’’ এর সংগে জড়িত সকল বিষয় সমন্ধে ট্রেনারকে জানতে হবে। তাঁদের কাজ, কাজ করার পদ্ধতি, কাজের পরিবেশ, আইন কানুন কোন কিছুই বাদ যাবে না।

 

এ ধরনের প্রায়শ জিজ্ঞাস্য কিছু প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা হলোঃ-

* সবাই কি ভোটার হতে পারবে ?

না।

* তা হলে কারা কারা ভোটার হতে পারবে?

বাংলাদেশের নাগরিক, যাঁর বয়স ১লা জানুয়ারী,২০০৮ সালে ১৮ বছর হয়েছে বা হবে, যদি কেহ কোন আদালত কর্তৃক মানসিক প্রতিবন্ধী হিসাবে ঘোষিত হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। যেকোন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ভোটার হতে পারবেন। জেল খাটা সাজাপ্রাপ্ত আসামী ও কয়েদীরাও ভোটার হতে পারবেন। কেউ বাদ যাবে না।

* আমরা তো মাত্র কয়েক দিন ভোটার তালিকা করবো। তখন যদি কোন ব্যক্তি না থাকে, তাহলে সে কিভাবে ভোটার হবেন?

ভোটার তালিকা তৈরী চলাকালে কোন ব্যক্তি এসে যোগাযোগ করলে তাঁকে ভোটার করা হবে। প্রতিবছর ২রা জানুয়ারী হতে ৩১শে জানুয়ারী পর্যন্ত ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হবে। তখন তিনি ভোটার হতে পারবেন। বছরের যে কোন সময়ে ভোটার হওয়ার জন্য রয়েছে আইন ও পদ্ধতি। এ জন্য ভোটারকে রেজিষ্ট্রেশন অফিসারের সংগে যোগাযোগ করতে হবে। এছাড়াও নির্বাচন তফসীল ঘোষণা হওয়ার পরও যে কোন ব্যক্তিকে ভোটার করার জন্য নির্বাচন কমিশনের রয়েছে বিশেষ ক্ষমতা।

* অনেক ভোটার তার জন্ম তারিখ জানে না। তাঁর বয়স কি করে ঠিক করবো?

আমি আপনার সাথে মত। এটা বাংলাদেশের বাস্তবতা। এটাকে মেনে নিয়েই আমরা কাজ করবো। এ ক্ষেত্রে আমাদের আন্দাজ করতে হবে। কৌশল হিসাবে আমরা তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিতে পারি কোন বিশেষ ঘটনার, যা প্রায়ই সবাই মনে রাখে। তাকে ভিত্তি ধরে আমরা বয়সটা আন্দাজ করতে পারি। তারপর শীতকালে জন্ম, না গরমের সময়, এটা জেনে নিয়ে আন্দাজ করে একটা তারিখ বসানো যেতে পারে। যেমন, একজন ভোটারকে জিজ্ঞাসা করা হলো স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে না পরে। ভোটার বললেন, মা বলেছে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমি কোলে। শীতের সময় আমার জন্ম। তাহলে আন্দাজ করে ধরে দিতে পারি তার জন্ম ১লা জানুয়ারী, ১৯৭৫।

* অনেকে বাবা, স্ত্রী বা মায়ের নাম জানে না। তখনকি করবো?

বাবা, স্ত্রী বা মায়ের নাম না জানা ভোটারের সংখ্যা খুব বেশী নয়। এর পরও এটা সত্য যে, এ ধরণের ভোটার রয়েছে। এদেরকেও ভোটার তালিকার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ জন্য আশে পাশের লোক জনকে জিজ্ঞাসা করবেন। তাঁদের কাছ থেকে জেনে নিয়ে ফরম পূরণ করবেন। এভাবেও না পাওয়া গেলে ফাঁকা রেখে দিন। তথ্য সংগ্রহকারী তার রেজিষ্ট্রারে মন্তব্য কলামে বিষয়টি লিখে রাখবেন।

* কোথায় ভোটার হতে পারা যাবে?

আপনি যেখানে অবস্থান করছেন, যদি সেখানে আপনি ঘুমান, যদি আপনার মাথার উপরে একটি পলিথিনও থাকে, তবে আপনি এখানেই ভোটার হতে পারবেন। আপনি সেখানেই ভোটার হতে পারবেন যদি আপনার একটি স্থায়ী বা অস্থায়ী নিবাস যাকে এবং আপনি সচরাসচর বসবাস করেন।

* আমি কি একাধিক জায়গায় ভোটার হতে পারবো?

না। একাধিক এলাকায় ভোটার হলে এবং ধরা পড়লে তথ্য গোপন করার দায়ে আপনাকে দোষী করা হবে। আপনার জেল জরিমানাও হতে পারে।

* অনেকে স্থায়ী ঠিকানা জানে না। তখন কি করবো?

স্থায়ী ঠিকানা অনেকের জানা থাকে না। আসলে যার স্থায়ী ঠিকানা জানা নাই তার কোন স্থায়ী ঠিকানাই নাই। অনেকেই স্থায়ী ঠিকানায় বাড়ি নম্বর, রাস্তার নাম, মহল্লার নাম, ওয়ার্ড নম্বর, পোস্টকোড জানে না। এ রকম ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহকারীর পক্ষে তা খুঁজে বাহির করা সম্ভব নয়। এভাবেই রেখে দিন। রেজিস্ট্রারে মন্তব্য কলামে লিখে রাখবেন।

* বর্তমান ঠিকানার ভোটার এলাকা, পোস্টকোড, জানা না থাকলে কি করবো?

বর্তমান ঠিকানার ভোটার এলাকার, নাম ও নম্বর, পোস্টকোড, মহল্লা, ওয়ার্ড, রাস্তার নাম ও নম্বর আপনার জানা আছে। আপনি দয়া করে পূরণ করে দিবেন। ভোটারের এগুলো না জানলেও চলবে। তবে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারে অবশ্যই জানা থাকতে হবে।

* আর.এম.ও কি?

আরএমও হলো রুরাল অর্থাৎ গ্রাম; মিউনিসিপ্যালিটি অর্থাৎ শহর এবং আদারস্ অর্থাৎ অন্যান্য এলাকা, যেমন: ক্যান্টনম্যান্ট বোর্ড।

* টি.আই.এন (TIN) কি?

টি.আই.এন (TIN) অর্থাৎ Tax Identification Number . এটা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রতিটি করদাতাকে চিহ্নিত করার জন্য ব্যবহার করে।

* IRIS কি?

IRIS হলো চোখের করণিয়ার পিছনো রঙ্গিন গোলাকার অংশ। প্রতিটি মানুষের জন্য আলাদা আলাদা। তাই এটা বায়োমেট্রিস হিসেবে কাজে লাগে।

* DNA কি?

DNA হলো deoxyribonucleic acid. প্রতিটি মানুষের জন্য এটা আলাদা। তাই প্রতি মানুষকে এটা দিয়ে আলাদা করা যায়।

* তথ্যদাতার বাম হাত না থাকলে কি করতে হবে?

বামহাত না থাকলে ডান হাত। দুই হাত না থাকলে পায়ের আঙ্গুলের ছাপ নেয়া যেতে পারে। তবে যাই করুন, তা আপনাকে লিখে দিতে হবে।

* আঙ্গুলের ছাপ কোথায় নিতে হবে?

আঙ্গুলের ছাপ বাড়ীতে গিয়ে ফরম পূরণ করার সময় নিতে হবে।

* কিভাবে নিব?

এজন্য আপনাকে স্ট্যাম্প প্যাড দেয়া হবে। বাড়ী বাড়ী তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়ার আগে প্যাডটা হাতে করে নিয়ে যাবেন।

* আঙ্গুলের ছাপ আড়াআড়ি নিব না খাড়াখাড়ি নিব?

যেকোন এক ভাবে নিলেই চলবে। তবে দুই আঙ্গুলের ছাপ একভাবে নিবেন।

* সনাক্তকারী কে হবেন?

ভোটারের বাড়ীর অন্যকোন একজন ভোটার। পাওয়া না গেলে পাশের বাড়ীর একজন ভোটার।

* সনাক্তকারীর নাম ও দস্তখত একই। এক্ষেত্রে নাম ও দস্তখত উভয়ের প্রয়োজন আছে কি?

- না, নাই।

* PIN কি?

Personal Identification Number. কম্পিউটার কর্তৃক তা প্রতিটি ভোটারকে প্রদান করা হবে।

* সনাক্তকারী কে হবেন?

যাচাইকারী শহর এলাকার জন্য ওয়ার্ড কমিশনার, ওয়ার্ড মেম্বার (পুরুষ ও মহিলা) এবং নির্বাচনে তাঁদের ১ম ও ২য় নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার এবং ওয়ার্ড মেম্বার (যদি একই ব্যক্তি না হন)। নির্বাচন সেন্টারে যাচাইকারীগণ ভোটারদের তথ্য যাচাই করার পর দস্তখত করবেন।

* ফরম অংশ ও রশিদ অংশ উভয় জায়গায় তথ্য সংগ্রহকারীর নাম ও স্বাক্ষর রয়েছে। উভয় দস্তখত কি এক সংগে দিতে হবে?

না, একসঙ্গে দিতে হবে না। ভোটারের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ফরমটি পূরণ করার পর ফরমটি রেজিস্ট্রেশন কেন্দ্রে জমা দিলে, কেন্দ্র হতে ছবি তোলা, আঙ্গুলের ছাপ নেয়া ও দস্তখত করার জন্য এলাকাভিত্তিক তারিখ, সময় ও সংখ্যা নির্ধারণ করে দিবেন। এগুলো পাওয়া গেলে তথ্য সংগ্রহকারী ভোটারদের নিয়ে রেজিস্ট্রেশন কেন্দ্রে যাবেন। ছবি তোলা, আঙ্গুলের ছাপ নেয়া হলে রশিদ অংশে তথ্য সংগ্রহকারী দস্তখত করে ভোটারকে দিবেন।

* একসংগে অনেকের অনেক জিজ্ঞাসা হলে কি করবেন?

বাঙ্গালীদের একটা বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা একসঙ্গে প্রশ্ন করা শুরু করেন। কোন কিছু বোঝার উপায় থাকে না। কেউ কারো কথা শুনে না। সবাই বলতে থাকে। প্রশিক্ষক হিসেবে আপনাকে শক্তহাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একসংগে একজনের বেশী প্রশিক্ষণার্থীকে কথা বলতে দিবেন না। একজনের প্রশ্ন ও উত্তর শেষ হলে অন্যজনকে প্রশ্ন করার সুযোগ দিন।

* বাড়ী গিয়ে ভোটারকে না পেলে কি করতে হবে?

বার বার যাবেন। যতক্ষণ না তাঁর কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যায়।

* কেউ ভোটার হতে না চাইলে কি করবো?

তাঁকে বলবেন ভোটার না হলে তিনি জাতীয় পরিচয়পত্র পাবেন না। জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত আইনে কোন সুবিধা দিলে আপনি তা পাবেন না। এরপরও তিনি ভোটার হতে না চাইলে তথ্য সংগ্রহকারী তাঁর রেজিস্ট্রারে তা লিখে ভোটারের দস্তখত নিয়ে রাখবেন।

* দেশে কিছু হিজড়া রয়েছে তাদের লিংগ কি হবে?

পুরুষের মত কাপড় পড়ে থাকলে পুরুষ এবং মেয়েদের মত কাপড় পড়ে থাকলে মহিলা লিখবেন।

* কিছু মহিলা/পুরুষ, ভারত বা মায়নমারে (বার্মা) বিয়ে করেছেন কিন্তু বাংলাদেশে থাকেন তাঁদের স্বামী/স্ত্রীরা কি ভোটার হতে পারবেন?

ভোটার হতে চাইলে তাঁর তথ্য সংগ্রহ করবেন। রেজিস্ট্রার খাতায় বিষয়টি মন্তব্য কলামে লিখে রাখবেন। পরে যাচাইকারী আপত্তি করলে আইনানুগভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

* হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছেন। মুসলমানকে বিয়ে করেছেন। তার মা-বাবার নাম বলতে না চাইলে কি করবো?

তাঁকে বুঝিয়ে বলুন। তারপরও সে না চাইলে আমাদের কিছুই করার নাই। নামের জায়গা ফাঁকা রেখে রেজিস্ট্রারে মন্তব্য কলামে লিখে রাখুন।

* এক ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী রয়েছে। কোন স্ত্রীর নাম লিখবো?

একাধিক স্ত্রীর নাম লিখার কোন অবকাশ নাই। একজনের নাম লিখতে হবে। এক্ষেত্রে স্বামীর সংগে বসবাসকারী জীবিত ১ম স্ত্রীর নাম লেখাই উত্তম।

* তথ্য সংগ্রহকারীর যোগ্যতা কি?

কোন রাজনৈতিক দলের সংগে যুক্ত নন। এমন সরকারী, আধা-সরকারী, স্বায়ত্বশাসিত অথবা সরকারী অনুদানপ্রাপ্ত বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা/কর্মচারী/শিক্ষক ইত্যাদি যাঁদের বয়স ৫০ এর নীচে, শারীরিকভাবে সক্ষম, যার শিক্ষাগত যোগ্যতা অন্ততঃ এসএসসি, তাকেই তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ করা যাবে।

শত শত প্রশ্নের মাঝে মাত্র কয়েকটি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। এছাড়াও আরো নানা ধরণের প্রশ্ন থাকবে যার জবাব আপনাকে ট্রেনার হিসেবে দিতে হবে।এজন্য আপনি প্রস্ত্ততি নিয়ে রাখবেন। অনেক প্রশিক্ষণার্থী প্রশ্ন করার জন্য প্রশ্ন করবেন। তাঁকে প্রশ্রয় দিবেন না। দিলে পরে প্রশিক্ষণ ক্লাশ সামাল দেয়া যাবে না। বিষয়টি ট্রেনার হিসেবে আপনাকে মনে রাখতে হবে।

শেষ কথা

প্রশিক্ষণ হলো প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে বিশেষ কোন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে একটি নিবিড় যোগাযোগ প্রক্রিয়া। উভয়ই তাঁর অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান এর উপর ভিত্তি করে নতুন বিষয়গুলোকে বিচার বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবে। যখনই গড়মিল পাবে, সে জানতে চাইবে। তাঁর জানার ইচ্ছাকে ধমক দিয়ে থামাবেন না। বয়স্ক মানুষকে প্রশিক্ষণে ধরে রাখা খুব কঠিন কাজ। কাজটিকে সহজ করার জন্য প্রশিক্ষণের বিষয়বস্ত্তকে আকর্ষণীয় করে তুলুন। ছোট কোন গল্প, ঘটনা, কবিতার দু’একটা লাইন ব্যবহার পারেন। তবে মনে রাখবেন গল্প করতে করতে যেন সময় পার হয়ে না যায়। যাই করবেন, সবসময় মনে রাখবেন উদ্দেশ্য কি? উদ্দেশ্য পূরণ হলেই প্রশিক্ষণ সার্থক হবে।