আইসিটি মন্ত্রণালয়ের জন্ম কথা

Category: Governmental Written by Md. Rafiqul Islam Hits: 15330

সরকার ২৮শে এপ্রিল 2011 একটা প্রজ্ঞাপন জারী করে বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে আলাদা করে দু’টি বিভাগ গঠন করলো। পদ সৃষ্টি, রুলস অব বিজনেস এসব কাজগুলো ভিতর ভিতর হচ্ছিল বটে, বাহিরে থেকে কোন কিছু বুঝা যাচ্ছিল না। সব কিছূ আগের মত যেমন ছিল তেমনি চলছিল।

৫ই জুন 2011 জনপ্রশাসন আমাকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব নিয়োগ করেছে। 6ই জুন, 2011 সচিবালয়ে ‍বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মাননীয় প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান এর সংগে দেখা করতে গেলাম। আদেশ পেয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে অবমুক্ত হয়ে নতুন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি। পরিচয় দিয়ে তাঁকে আমার আদেশ ও দায়িত্বভার গ্রহণের পত্রটি দিলাম। তিনি অবাক হয়ে বললেন;

-“ আরে ভাই আপনি। আমি তো মনে করেছিলাম অন্য রফিক।” বলেই আদেশ ও দায়িত্বভার গ্রহণের আদেশটি পড়তে লাগলেন।

 

 

 

বাংলাদেশে রফিক নামটা বনে, বাজারে, রাস্তা ঘাটে, নর্দমা এমন কোন জায়গা নাই যেখানে পাওয়া যায় না বা শোনা যায় না। আমাদের প্রশাসন ক্যাডারে আমার সামনে পরে অনেক রফিক রয়েছে। তাই অন্য কোন রফিক ভাবা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এমন সময় তিনি পড়া শেষ করে বললেন;

-“ দায়িত্বভার তো গ্রহণ করেই নিয়েছেন। আমার জন্য তো কিছুই রাখেন নি।”

কোন জবাব দিলাম না। চুপচাপ থেকে একজন পিয়নকে ডেকে বললেন;

-“ আপনাদের আইসিটির নতুন সচিব, রফিক সাহেব, উনাকে চা বিস্কুট দেন।” পিওনটা ঘাঁড় নেড়ে নেড়ে বিদায় নিলো। মন্ত্রী মহোদয় বললেন;

-“ শুনেছি ৭৩টা নতুন পদ সৃষ্টি হয়েছে। একটা অর্গানোগ্রামও অনুমোদন হয়েছে। আপনার কোন লোকজন নাই।” শুনে জানতে চাইলাম;

-“ যে সকল কর্মকর্তা আইসিটির কাজ করেন তাঁরা নতুন বিভাগে আসবে না স্যার।” শূনে মুচকি হাঁসি দিয়ে বললেন;

-“ 13 নম্বর শাখায় অন্যান্য কাজের সাথে আইসিটির কাজও হয়। 13 নম্বর শাখাটাও বিজ্ঞান বিভাগেরই রয়েছে। আইসিটি বিভাগের 73জন জনবলের আপনিই প্রথম। আপনাকেই সব কিছু তৈরী করে দিতে হবে। পারলে শুরু করেন।” মনে মনে বললাম;

আমাকে পারতে হবে। আমি হেরে যাবো না। বাজেট, বসার জায়গা, প্রশাসনিক কোড এ সব বিষয় গুলো জানা দরকার। জিজ্ঞাসা করার জন্য ;

-“ স্যার।” মন্ত্রী মহোদয় আমার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বললেন;

-“ ও হ্যাঁ। আপনাকে আগেই বলা উচিৎ ছিল। এখানে কোন জায়গা নাই। আপনার বসার জায়গা, বাজেট এসব আপনাকেই করে নিতে হবে। সচিব আব্দুর রব হাওলাদার নাই, বিদেশে, ও আসার পর তার সাথে কথাবার্তা বলে ঠিক করে নিয়েন।”

-“ আচ্ছা।” বলে সম্মতি জানাইতেই তিনি জানতে চাইলেন;

-“ রব কি আপনাদের ব্যাচমেট?”

হ্যাঁ জবাব শুনে বললেন;

-“ তাহলে তো কোন অসুবিধা হবে না। বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব দিলিপ কাজ কর্ম দেখছে। তাঁর কাছ থেকে জেনে নিয়ে দৌড়া দৌড়ি শুরু করেন। গণপূর্ত সচিবের কাছে যান, বসতে হবে তো।”

আমি কোন জবাব দিচ্ছি না। আর মাত্র ৭ মাসের মাথায় সরকারী চাকুরী থেকে বিদায় নিবো। ভাগ্য ভালো, সচিব ও হলাম। তবে এ কেমন সচিব। আমাকে গম্ভীর দেখে বললেন;

-“ বাজেট, লোক জনের জন্য অর্থ , সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিন।” আমি কি যেন বলতে চেয়ে ছিলাম। আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন;

-“ আর হ্যাঁ আপনাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। ১লা ডিসেম্বর, 2011 ঢাকায় বংগবন্ধু আর্ন্তজাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আইসিটি সংক্রান্ত একটা বড় ইভেন্ট হবে, ই-এশিয়া। আপনিই তো এখন সচিব, আপনাকেই সব কিছু দেখতে হবে। অবশ্য বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক আছেন। ঐ সব দেখা শুনা করবে।” জবাবে বললাম;

-“ চেষ্টা করবো স্যার।”

মন্ত্রী মহোদয় জানালেন;

-“ ই-এশিয়া নিয়ে এখানে একটা সভা আছে। আপনি থাকবেন।”

মন্ত্রী মহোদয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অতিরিক্ত সচিব, দিলিপ এর রুমে গেলাম। পূর্ব পরিচিত সজ্জন মানুষ। আইসিটি বিভাগ সৃষ্টি সংক্রান্ত তার জানা সব কথায় জানালো। এক ফাঁকে বললো;

-“ ১৩ নম্বর শাখায় ইকরামুল নামে এক জন প্রশাসননিক কর্ম কর্তা আছেন। তিনিই আইসিটির কাজ কম© দেখেন।”

দিলিপের কাছে জানতে চাইলাম;

-“ তাঁর সংগে কথা বলতে পারি?” প্রশ্নটা শুনেই দিলিপ একটা চমৎকার হাঁসি দিয়ে বললো;

-“ কেন নয় ? স্যার ওকে ডেকে দিচ্ছি।” বলেই বেলটিপ দিলো।

দিলিপের বেল শুনে তার পিওন ঘরে ঢুকলে তাকে সে অর্ডার দিলো,

-“ স্যারকে চা দাও। পরে ১৩ নম্বর সেকশনের প্রশাসনিক কর্ম কর্তা ইকরামুল হককে ডেকে দিও।”

পিওন সাহেব আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন;

-“ স্যার চা, চিনিসহ না চিনি ছাড়া।” জবাবে বললাম;

-“ একটা হলেই হলো।”

পিওনটা চিনি ছাড়া এককাপ চা দিয়ে গেল। চা খাচ্ছি, একজন লোক রুমে ঢুকলো। মাঝারী গড়ন। বাচ্চা বাচ্চা চেহারা, দিলিপকে আদাব দিয়ে তাঁর উপস্থিতি জানান দিলো। দিলিপ সোফায় বসা আমাকে দেখিয়ে বললো;

-“ আপনাদের আইসিটি সচিব নতুন যোগদান করেছেন। এখন থেকে আইসিটি সংক্রান্ত সব কাজ তাঁর সংগে করবেন।”

ইকরাম তাঁর স্বভাব সুলভ হাঁসি দিয়ে বললো;

-“ তেমন কোন কাজ কর্ম নাই স্যার। আমি আছি, কোন অসুবিধা হবে না।” জানতে চাইলাম;

-“ আপনার পিওন, ষ্টেনো টাইপিষ্ট আছে?”

আবারও একটা সুন্দর হাঁসি দিয়ে বললো;

-“ না স্যার। কেউ নাই। আমিই সব।”

অবাক হয়ে ভাবছি। কোথাকার ভারপ্রাপ্ত সচিব বানানো হলো।

দুপুর প্রায় শেষ হওয়ার পথে। দিলিপ খাবারের কথা জিজ্ঞাসা করলো। ক্ষিধা ছিল তবে তাঁকে কষ্টদিতে চাইনি। উল্টো তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম;

-“ দুপুরে তুমি কি করো? বাড়ী থেকে খাবার আনো?”

জবাবে সে জানালো;

-“ প্রায় সময় বাসা থেকে আনি। কোন দিন আনতে না পারলে ক্যান্টিন থেকে এনে খেয়ে নেই।”

2001 সালে প্রথমে ওএসডি তার পর এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, আজ 2011 সাল এর মধ্যে আর কোন দিন সচিবালয়ে পোষ্টিং হয়নি। দীর্ঘ দশ বছরের পরিক্রমায় অনেক অদল বদল ওলোটপালোট হয়েছে। এগুলো আমার আজ আর জানা নাই। জানতে চাইলাম,

-“ সচিবালয়ে দুপুরে কি কি খাবার পাওয়া যায়?”

দিলিপ একটা লম্বা ফিরিস্তি দিয়ে বললো;

-“ এর চাইতে ভালো কিছু চাইলে বাহিরে রাস্তায় ওপারে খেতে হবে স্যার।” জবাবে জানালাম;

-“ দিলিপ আমি ভেজিটেরিয়ান; মাছ, মাংস কিছুই খাই না। শব্জি ও রুটি বা পরটা একটা হলেই চলে।” দিলিপ অবাক হয়ে জানতে চাইলো;

-“ কোন দিন মাছ, মাংস খান নি? কি ভাবে আছেন?”

একটু কৌতক করে বললাম;

-“ গরু কোন দিন মাছ-মাংস খায় নি, গরু আজও বেঁচে আছে। আমি গরু জাতীয় প্রাণী।” দিলিপ লজ্জা পেয়ে বললো;

-“ সরি স্যার।”

ই-এশিয়া,2011 সংক্রান্ত সাংগঠনিক কমিটির 08.06.2011 তারিখের সভা হলো। প্রতিমন্ত্রী মহোদয় চেয়ার, মুখ্য সচিব কো-চেয়ার করছেন। বাংলাদেশ কম্পউটার কাউন্সিল, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই এবং ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠান সিএসডিএমএস যৌথভাবে ই-এশিয়ার আয়োজন করছে ৪ বার। 2006 সালে ব্যাংকক, 2007 সালে থাইল্যান্ডে, 2008 সালে মালেয়শিয়ায়, সবশেষ 2009 এ শ্রীলংকায় ই-এশিয়া হয়েছে। 2011তে বাংলাদেশের ঢাকায় ই-এশিয়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক জনাব মাহফুজুর রহমান, আমার ব্যাচমেট পরিচিত জন। এখনও এ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসাবে আনুষ্ঠানিক পরিচয় হয়নি। সভায় প্রাক্কলে আনুষ্ঠানিক পরিচয় হলো। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সচিব হিসাবে কমিটির সদস্য না হলেও উপস্থিত থাকলাম। পরে কো-অপট্ করা হলো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ১লা ডিসেম্বর, ২০১১ উদ্বোধন এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি ৩রা ডিসেম্বর, সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী পুরস্কার প্রদান করবেন। সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ের ৪০-৫০ টি দেশের প্রায় ৯০০ প্রতিনিধি ই-এশিয়া, ২০১১ এ উপস্থিত থাকবেন। সভা শেষ হ’ল। মন্ত্রী মহাদয়ের কক্ষে গেলাম। তিনি জানতে চাইলেন;

-“ আইসিটি বিভাগের অর্গানোগ্রাম দেখেছেন?” জবাবে জানালাম;

-“ না ! স্যার।” তিনি জানালেন;

-“ কাগজগুলো সংগ্রহ করে দেখে নিবেন।”

দিলিপের রুমে গিয়ে ইকরামকে ডাক দিলাম। অর্গানোগ্রাম ও পদ সৃষ্টির চিঠি গুলো নিলাম। ইকরাম জানতে চাইলো;

-“ স্যার অনেক গুলো চিঠি ডাকে পড়ে আছে। কেউ নিতেছে না। আমি কি করবো?” বললাম;

-“ নিয়ে আসেন আমি দেখে দিবো।”

ও চিঠি গুলো নিয়ে আসলো। আমি দেখে নির্দেশনা দিয়ে চিঠি গুলো আবারো তাকে মার্ক করলাম।

আইসিটি বিভাগের যাত্রা শুরু হলো। সচিব আব্দুর রব হাওলাদার ফিরে এসেছেন। তাঁর সংগে কথা হলো। তিনি জানালেন;

-“ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ, মন্ত্রণালয় আগে যে অবস্থায় ছিল তাই আছে। নতুন ৭৩জন জনবল নিয়ে আইসিটি বিভাগ তৈরী হয়েছে। আপনি কোন জনবল পাবেন বলে মনে হয় না।” শুনে অবাক হয়ে বললাম;

-“ লোকজন ও বসার জায়গা না পেলে কোথায় কি ভাবে কাজ করবো?” সব কিছু মন্ত্রী মহোদয়কে জানালাম। তিনি বললেন;

-“ আপনাকেই তৈরী করে নিতে হবে। যদি আমার কোন সাহায্য লাগে করবো।”

একটা বিভাগের সবার বসার জায়গা, আসবাবপত্র, কম্পিউটার, প্রিন্টার, টেলিফোন, ফ্যাক্স কিভাবে হবে আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মরার উপর খাড়ার ঘা ই-এশিয়া ২০১১। আমার মুখ দেখেই মন্ত্রী মহোদয় কিছুটা বুঝে আমাকে আশ্বস্থ করলেন;

-“ ই-এশিয়া নিয়ে আপনাকে কোন চিন্তা করতে হবে না। বিসিসি এর নির্বাহী পরিচালক দেখবেন। আপনি বিভাগটা দাঁড় করান।”

জায়গার বিষয়টা মন্ত্রী মহোদয়কে জানালাম। তিনি ক্যাবিনেট সচিব ও পূর্ত সচিবকে টেলিফোন করলেন। ফোন শেষ করে আমাকে বললেন;

-“ এ ভাবে হবে না। আমাদেরকেই আমাদের জায়গার একটা ব্যবস্থা করে নিতে হবে। হাই-টেক পার্ক, জনতা টাওয়ার, বিসিসিতে গিয়ে দেখেন। কোন জায়গা পাওয়া যায় কিনা?”

পরের দিন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলে আসলাম। কার্যনির্বাহী পরিচালক অফিসের বাহিরে। কন্ট্রোলার অব সার্টিফাইং অথরিটি কোথায়, জানতে চাইলে বলা হলো, এটাও সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রতিষ্ঠান। ৩৫ জন জনবল নিয়ে এর গঠন চুড়ান্ত করা হবে। নিয়োগ বিধি চুড়ান্ত না থাকায় এখনও জনবল নিয়োগ দেয়া হয়নি। কার্য নির্বাহী পরিচালক, বিসিসি, কন্টোলারের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।

৪ তলায় হাই-টেক পার্ক অথরিটির কার্যালয়। একমাত্র কর্মকর্তা প্রশাসন ক্যাডারের যুগ্ম-সচিব, প্রেষণে হাই-টেক পার্ক অথরিটির ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, বাকি ৭৫ টি পদ শূন্য । হাই-টেক পার্ক অথরিটি গঠন কল্পে জিওবি এর অর্থায়নে একটি প্রকল্পে প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালক হিসাবে কাজ করছেন। তার সংগে একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, কয়েকজন টাইপিস্ট আর এম এল এস এস রয়েছে।

পাশে জাতীয় ডাটা সেন্টার, এক পাশে এমডি, প্রকল্প পরিচালকের রুম, মাঝখানে কিউবিক্যালস, মাঝে বারান্দায় পাটিশন দিয়ে কনফারেন্স রুম করা হয়েছে। ব্যবহার হয় বলে মনে হলো না। রুমের কমোডটাও নষ্ট। ফ্লাস হয় না। রুমে সুইপারদের ঘর মোছার ঝাড়ু, ন্যাকড়া, বালতি। দেখে মনে হলো, ৪ তলার ময়লা কাগজপত্র প্রতিদিন ঝাড়ু দিয়ে তা হল রুমে জমা করা হয়। সময়মত একদিন সুইপার দয়া করে এগুলো ফেলে আসেন।

বসার কোন জায়গা পাচ্ছি না। আমার কোন ঠিকানা না থাকলেও চলে। কিন্তু আইসিটি বিভাগের সচিবের একটা ঠিকানা প্রয়োজন। ঠিকানা হিসাবে রুমটা পছন্দ হলো। সুইপার খুজলাম, পেলাম না । সুইপার ঝাড়ুটা হলরুমের কোনায় রেখে গেছেন দেখে খুশি হলাম। ঝাড়ুটা দিয়ে রুমটা পরিষ্কার করছি। কে যেন একজন এসে জিজ্ঞাসা করলেন;

-“ এটা কি করছেন স্যার ? কেন করছেন ?” হাঁসতে হাঁসতে জবাব দিলাম;

-“ ঝাড়ু দিচ্ছি। কেন দিচ্ছি ? আমি এখন থেকে এখানে বসবো।”

সে ঝাড়ুটা আমার হাত থেকে নেয়ার চেষ্টা করলেন। তাঁর ধারণা আমার এ কাজ করা ঠিক নয়। বললাম;

-“ ইউরোপে পড়াশুনা করেছি। ওখানে নিজের কাজ নিজেই করতাম। কাপড় কাঁচা, ঝাড়ু দেয়া, রান্না করা, হাঁড়ি বাসন ধোয়া, সব কিছু। আগে করেছি, এখনও করি।”

ঝাড়ু দেয়া শেষ করতে পারলাম না। আমার হাত হতে সে ঝাড়ুটা নিয়ে গেল। সে ঘরটা পরিস্কার করে দিলো। কিউবিক্যাল হতে একটা চেয়ার টান দিয়ে নিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের শূভ যাত্রা শুরু করলাম।

ইচ্ছে ছিল বিসিসি ভবনের কিছু প্রকল্প, অফিস অন্যত্র সরিয়ে দিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বসার ব্যবস্থা বিসিসি ভবনেই করবো। পারলাম না।

বিসিসি এর পাশেই বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি ভবন ব্যান্সডক। ৪ তলা ভবন, জনবল ৩৫ জন, তাও কাজ নাই। বলতে গেলে ফাঁকা।

মনির হোসেন, মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা; ডিজিটাল সার্টিফিকেট নিয়ে কাজ করেন। মন্ত্রী মহোদয়ের খূব কাছের মানুষ। তিনি পরামর্শ দিলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ব্যান্সডক ভবনের নিচতলা ও ১ম তলায় স্থাপন করার। মন্ত্রী মহোদয় আমাকে ব্যান্সডক ভবনে আইসিট বিভাগ স্থাপনের নির্দেশ দিলেন। তাই অবাক হলাম না। আজও বসার কোথাও ঠাই হয়নি। সব কিছু চিন্তা করে রাজী হয়ে গেলাম।

নতুন বিভাগের জন্য তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয় হতে প্রশাসনিক কোড প্রয়োজন। আর্থিক কোড ছাড়া অর্থ বরাদ্দ মিলবে না। কোডের বিপরীতে নতুন আর্থিক ব্যবস্থাপনার নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকে উইন্ডো খুলে তার একটা এন্ট্রি পয়েন্ট প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার দপ্তরে খুলতে হবে। ভাগ্য ভালো সংস্থার নামে বরাদ্দ আছে, যদিও তা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের বাজেট কোডের অধীনে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের জন্য তাও নাই। অর্থ বিভাগের বাজেট থোক বরাদ্দ থেকে বাজেট ও খরচের অনুমতি আনতে হবে। বিভাগের নামে নতুন চেক ছাপাতে হবে। নিজে খসড়া লিখি, হাই-টেক পার্ক অথরিটিকে প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক, শফিকের দপ্তর হতে টাইপ করি, পরে সকালে বা বিকালে সচিবালয়ে গিয়ে দিয়ে আসি। এভাবে হার্ড কপির কাজ সারি। বাকি অফিসের অন্য কাজ কম©, ই-মেইল, ওয়েব এ সেরে ফেলি। নিজের তশিবা ল্যাপটাপ এবং গ্রামীনের জুম মডেম দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছিলাম। এসব দিয়ে কাজ করছি, নিজেকে সত্যিকারের আইসিটি সচিব মনে হতো।

নির্বাচন কমিশন থেকে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা দেখা করতে এসেছেন, সংগে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা আহমেদ মোর্শেদও আছেন। কথাচ্ছলে মোর্শেদ বলে বসলেন;

-“ লোকজন আনেন স্যার। এটা সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর। লোকজন ছাড়া আপনি এসব কাজ করতে পারবেন?” জবাবে বললাম;

-“ লিখতে লিখতে, বলতে বলতে হাত মুখ ব্যাথা করে ফেলেছি। কেউ আসতে চায় না।”

আরও বললাম;

-“ বসার জায়গা নাই। চেয়ার টেবিল, পিয়ন, পেয়াদা গাড়ী ঘোড়া কোনটাই নাই। আজও জানি না কবে বাজেট আসবে। কবে আমি বেতন ভাতা পাবো।”

জবাবে মোর্শেদ জানালো;

-“ আপনার আপত্তি না থাকলে আমি স্যার রাজি।”

ওঁকে আমার পাগল মনে হলো। আমার যা অবস্থা, তাঁর মত কিছু পাগলই দরকার। বললাম, তোমার ডিটেইলস পার্টিকুলার দাও। আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি। তুমি হাতে করে নিয়ে যাও। পারসু করে অর্ডার করবা।

সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। একটা ডিও লিখে স্বাক্ষর করে তাঁর হাতে দিলাম। ওরা বিদায় নিলো। দু দিন পরে মোঃ বিল্লাল হোসেন নামে একজন দেখা করতে চান। অবাক হলাম। তাঁকে আসতে বললাম, ‘সালাম, নাম পরিচয় দিয়ে জানালো, এক মাস আগেই, তাঁর উপ-সচিব হিসাবে আদেশ হয়েছে। কোথায় কার কাছে যোগাদান করবেন জানা ছিল না। তাই আসেননি।

-“ আগের পোস্টিং কোথায় ছিল?” জানতে চাইলাম। জানালো;

-“ পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর।”

তাঁকে আইসিটি বিভাগের সবকিছু জানালাম। তারপর বললাম;

-“ সব কিছু শুনেছেন। এবার আপনি সিদ্ধান্ত নেন, যোগদান করবেন কিনা?” জবাবে জানালো;

-“ স্যার! ভেবে ছিলাম এটা সচিবালয়ের ভিতরে। অনেক দিন বাহিরে ছিলাম তাই রিলিজ হয়ে গেছি। সত্য কথা কি স্যার, গত কাল যোগদান করতে সচিবালয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগে গিয়েছিলাম। ওখান থেকে জানতে পারলাম এখানে যোগদান করতে হবে।”

-“ যোগদান পত্র এনেছেন?” জানতে চাইলাম;

যোগদান পত্রের একটি কপি সে আমার হাতে দিলো। আমি যোগদান পত্রটির উপর লিখলাম।

-“ স্বাগতম! গৃহীত।”

লিখে তাঁর হাতে ফেরৎ দিলাম। সে জানতে চাইলো;

-“ যোগদান পত্রটা এনডোর্স করতে হবে।” বললাম;

-“ হ্যাঁ। আমারটাও করা হয়নি। তৈরী করে আনবেন; আমারটায় আপনি. আপনারটায় আমি স্বাক্ষর করে দিবো।”

১ম সমস্যা ছিলো একটা সিটিং এ্যরেঞ্জমেন্ট করা। চেয়ার টেবিল, যন্ত্রপাতি কেনা, লোক নিয়োগ করা। ব্যান্সডক এর দুই তলা মিলে বসার জন্য তিনটা মাত্র রুম। কোথায় কাকে বসতে দিবো। তাই আলাদা ভাবে অস্থায়ী কিউবিক্যবলস তৈরী করতে হবে। এজন্য নক্সা, প্লান, অনুমোদন, অর্থ বিভাগের বরাদ্দ সব কিছুর জন্য দৌড়াদৌড়ি শুরু করলাম। অনেক দূর আগালাম। এ যন্ত্রনা কেবল ভুক্ত ভুগীই জানেন।

ক’দিন পর মোর্শেদ এর উপ-সচিব হিসাবে আইসিটিতে, আদেশ হলো। বিল্লাল, মোর্শেদ ব্যাচমেট। তাঁদের বললাম, তোমরা যখন যা প্রয়োজন করতে থাকো। অনুমোদনের অপেক্ষা করো না। পরে অনুমোদন করে দিবো। সংস্থা গুলোকে নির্দেশ দিলাম, তাঁরা একই বিষয়ে দুটো নথি খুলতে। একটি সংস্থার, অন্যটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের নামে। উভয় নথিতে তারা এবং বিভাগ স্বাক্ষর করবে। একটা নথি বিভাগে অন্যটি দপ্তরে থাকবে। সময় সুযোগ মতো বিভাগের নথি খোলা হবে।

দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক ইনফরমেশন হাইওয়ে নামক এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রকল্পটির বাস্তবায়ন দায়িত্ব এখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের নিকট ন্যস্ত। প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক শ্যামা প্রশাদ বেপারী, উপ-সচিব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তা । এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী প্রকল্প পরিচালক একই বিভাগের না হলে ব্যাংক লোন কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হবে না।

প্রকল্প পরিচালক বদল করাও চাটি খানি কথা নয়। যে দু-জন উপসচিব আছেন তাঁরা, জুতো সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ সব কিছুই করেন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের তাঁদের ঘাঁড়ে চাপানোর কোন ইচ্ছে আমার ছিলনা। তাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের উপ-সচিব শ্যামা প্রশাদ ব্যাপারীকে বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিভাগ থেকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে ন্যস্ত করার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ডিও লিখলাম।

ইতোমধ্যে মাছুমা আকতার, সিনিয়র সহকারী প্রধান হিসাবে আইসিটিতে যোগদান করেছেন। ক’দিন পরেই একজন সিনিয়র সহকারী সচিবও পেলাম। আরও একজন সিনিয়র সহকারী সচিব এবং একজন যুগ্ম-সচিব যোগদান করলেন। সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে ৯জন এম.এল .এস.এস এবং একজন একাউন্টেন্ট নিয়োগ দেয়া হলো।

গণপূর্ত অধিদপ্তর নক্সা অনুযায়ী কিউবিক্যাল নির্মাণ শেষ করেছে। কিউবিক্যালগুলোকে কাজের উপযোগী করার জন্য ইলেকট্রিক্যাল লাইন, লাইট, ফ্যান সংযোগ, ইন্টারনেট কানেকটিভিটি স্থাপন, এখনও বাকি।

প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, কম্পিউটার অপারেটর, প্রোগ্রামার, সিস্টেম এ্যানালিস্ট পদের কোনটিতেই নিয়োগ বংলাদেশ কর্মকমিশন সমাপ্ত করেনি। সহায়ক এসব কর্মকর্তা কর্মচারী ছাড়া একটা বিভাগ চালু করা যায় না। তবুও চেষ্টা চলেছে।

বিসিসি এর কার্য নির্বাহী পরিচালকের দপ্তর হতে দুটি কম্পিউটার, একটি ফ্যাক্স, ২জন কম্পিউটার অপারেটর, হাই-টেক পার্ক অথরিটি হতে টাইপিস্ট, ড্রাইভার, এম,এল,এস,এস এনে বিভাগটি চলছে।

ই-এশিয়া ২০১১ যাত্রা মুখ্য সচিব মহোদয়ের উদ্যোগে শুরু হয়। তিনি ২৯ শে নভেম্বর, ২০১১ তিনি অবসর নিলেন । বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কার্যনির্বাহী পরিচালক পদোন্নতি পেয়ে সংসদ বিষয়ক সচিবালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব হয়ে চলে গেলেন। এ টু আই এর প্রকল্প পরিচালক সেমিনার এবং উদ্বোধনী দুটো জটিল ইভেন্ট এর দায়িত্ব পালন করছেন। এর বাহিরেও রয়েছে অনেক কিছু। এগুলো অর্গানাইজ করবে কে এ নিয়ে মাথা গরম।

ড. জ্ঞানেন্দ্র সরকারের অতিরিক্ত সচিব, বিসিসির কার্যনির্বাহী পরিচালক হিসাবে যোগদান করেলেন। তিনি নতুন মানুষ। তার পক্ষে সব কিছু সামাল দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এস.এস.এফ, ও মন্ত্রণালয়গুলো থেকে বিভাগের কাছে ই-এশিয়া অগ্রগতি জানতে চায়। তারা বিসিসি চেনে না। কথা ছিল ই-এশিয়া ২০১১ নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যাথা থাকবে না। এখন পূরো মাথাটাই ঢুকাতে হলো। সব কিছু ঠিকমত সমাপ্ত হলো।

আয়োজক, অতিথি সবাই খুশি। বলছে; ইতোপূর্বে আয়েজিত সকল ই-এশিয়ার চেয়ে এটি ছিল সফল, আলাদা, ছিমছাম, সুন্দর।

সমাপনী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মহোদয় আয়োজনে মুগ্ধ হয়ে বললেন, ‘সাবাস বাংলাদেশ। সত্যই সাবাস বাংলাদেশ।

১৩ নম্বর শাখার অংশ আজ একটি বিভাগ।

ই-এশিয়া ২০১১ সমাপ্ত হয়েছে। ৫ ই ডিসেম্বর-২০১১, সরকার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে মন্ত্রণালয় করেছেন। জনাব আবুল হোসেন সাহেবকে এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। নতুন মন্ত্রী মহোদয়ের সংগে কথা হলো।

বিকালে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি টেলিফোন করলেন;

-“ কনগ্রাচুলেশন। এটা আমাদের সবার বিজয়। আমাদের দীর্ঘ দিনের দাবী। এটাকে সেলিব্রেট করতে হবে।” জবাবে বললাম;

-“ বিজয় যখন আপনাদের এ দায়িত্বটাও আপনাদের নিতে হবে।”

তিনি জবাবে বললেন;

-“ অবশ্যই।”

বলেই টেলিফোনটা কেঁটে দিলেন। বাঁচলাম। ব্যান্সডক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের কোন প্রতিষ্ঠান নয়। আগে একই মন্ত্রণালয়ের বিভাগের প্রতিষ্ঠান ছিল। কিছুটা হলেও অধিকার নিয়ে ছিলাম। আজ সে অধিকারটুকুও হারালাম। জায়গা নাই, জনবল নাই, যন্ত্রপাতি নাই, আছে শুধু আইসিটি মন্ত্রণালয়।