পরমাণু বিদ্যূৎ প্রত্যাশাঃ মস্কো যাত্রা

Category: Education Written by Md. Rafiqul Islam Hits: 4631

 

তেল বিদ্যুৎ দিয়ে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো যাবে না। ১৯৬১ সাল থেকেই এটা জানা ছিল। তাই রূপপরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করার মহা-পরিকল্পনা হাতে নেয়া হলো। পশ্চিম পাকিস্তান, তথ বর্তমান পাকিস্তানে পরমাণূ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন হলো। আমাদের মহাপরিকল্পনা ঘাপরিকল্পনায় পরিচিত হলো। দেশবাসী ভুলেই গিয়েছিল, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা আছে। স্থাপনা পাহারা দেয়ার জন্য সেখানে পরমাণূ শক্তি কমিশনের কিছু লোকজন কাজ করছে

 

নববই দশকের মধ্য ভাগ। লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছেসরকার একটা কিছু করতে চায়। রপপুর আবারও সকলের নজর কাড়লো। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কারখানা স্থাপনের প্রাসঙ্গিক কাজগুলো করার জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হলো। অনেকদর এসে একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই সবকিছু মুখথুবড়ে পড়লো। আশার কথা প্রকল্পটি চলমান ছিল।

ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ সেক্টরে ধস নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে কৃষি, শিল্প, বিপন্ন হবে। বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের আশ্বাস নিয়ে নতুন সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করলো। চটজলদি কিছু কুইক রেন্টাল, বেশ কিছু তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে সমস্যার ব্যাপকতা কমানো হলো। কুইক রেন্টাল সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। নতুন উদ্যোগে শুরু হলো রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ সবচেয়ে বড় দু’টো বিষয় হলো ‘অর্থায়ন এবং ব্যবহৃত জ্বালানী ব্যবস্থাপনা।’ রাশিয়ান ফেডারেশন রাজি। তাঁরা অর্থায়ন করবে, ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানী ফেরত নিয়ে যাবে। ফ্রান্স অর্থায়নে রাজি হলে ব্যবহৃত ফুয়েল ফেরত নিবে না। তাই রাশিয়া আমাদের জন্য উত্তম। ঋণের পরিমাণ, সুদ, পেব্যাক পিরিওড ইত্যাদি চূড়ান্ত করার জন্য নিগোশিয়েশন দরকার। একজন উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি নিগোশিয়েশন টিম গঠন করা হয়েছে। টিম মস্কো সফর করে আসলে। প্রাসঙ্গিক আলোচনার মাধ্যমে একটি মাঠ প্রস্ত্তত হলে। বাকিটা উভয় পক্ষের সাথে আলোচনা করে শেষ করতে হবে। সচিব হিসেবে এখানে নতুন যোগদান করেছি। এ নিয়ে বেশকিছু টেনশন আছে। সচিব নিগোশিয়েশন টিমের সদস্য ন। প্রথম সপ্তাহেই শান্তি বিনষ্ট হলো। নির্দেশিত হয়ে রবীন্দ্র নাথ রায় চৌধুরী সার-সংক্ষেপ উপস্থাপন করেছেন। সচিব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় নিগোশিয়েশন টিমের সদস্য হবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সার-সংক্ষেপের প্রস্তাব অনুমোদন করলেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০১৩ এর মধ্য ভাগে রাশিয়া সফর করবেন। সফরকালে চুক্তিটি স্বাক্ষরের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তোলপাড় চলছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সভা করলেন। তাঁকে জানানো হলো নিগোশিয়েশন টিমের প্রথম সভার সম্মত কার্যবিবরণী অনুযায়ী রাশিয়ান ফেডারেশন খসড় অর্থায়ন চুক্তি দিবে। যা আজও পাওয়া যায়নি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক সচিব বললেন, অনুমোদিত ডিপিপি ছাড়া অর্থায়নের বিষয়টি চূড়ান্ত করা যাবে না। মন্ত্রণালয় পড়লো বিপাকে। অর্থায়ন চুক্তি ছাড়া ডিপিপি তৈরী করা যায় না। পূর্ণাঙ্গ ফিজিবিলিটি হয়নি, অংগগুলো কি, দরদাম কিছুই জানা নাই, ডিপিপি তৈরী করবো কিভাবে । কোন কিছু না জেনেই কথা দিলাম;

-‘‘ আগামী ৩ দিনের মধ্যে ডিপিপি তৈরী হবে’’

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কাগজপত্র ঘেটে একটা ডিপিপি দাড় করা হলো। পররাষ্ট্র মন্ত্রী তা নিয়ে মস্কো দৌড় দিলেন। মস্কো থেকে অর্থায়ন চুক্তির খসড়া পাওয়া গেল।

প্রি-কনস্ট্রাকশন অংশের অর্থায়নের জন্য ৫০০ মিলিয়ন আমেরিকান ডলারের প্রস্তাব করা হয়েছে। শতকরা সাড়ে চার সুদে রাশিয়া অর্থায়ন প্রস্তাব করেছে। ভাবছি প্রি-কনস্ট্রাকশন হলো, তারপর কে টাকা দিবে? রূপপুর নিয়ে বাংলাদেশ এবং রাশিয়ান ফেডারেশনের সংগে আন্ত: সরকার চুক্তি হয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে অর্থায়নের একটি চুক্তি হবে। প্রথম নিগোশিয়েশন টিমের সম্মত কার্যবিবরণীতেও একটি চুক্তির উল্লেখ আছে। কনস্ট্রাকশনের অর্থায়নের নিশ্চয়তা প্রয়োজন। তা না হলে আগানো যাবে না।

নিগোশিয়েশন টিম বসে ঠিক করলো এই চুক্তিতে উল্লেখ থাকতে হবে; রাশিয়ান ফেডারেশন কনস্ট্রাকশন ফেইজ অর্থায়ন করবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডেকে বললেন,

- রাশিয়ায় বড় দিনের ছুটি হয়ে যাবে। চুক্তি চূড়ান্ত না হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রাশিয়া সফর বাতিল হবে। এ দায়-দায়িত্ব আমি ঘাড়ে নিবো না।’’

রাশিয়ান ফেডারেশনের রাষ্ট্রদূত মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে দেখা করলেন। তিনি মন্ত্রী মহোদয়কে বললেন,

-“আর মাত্র তিন দিন আছে। এরই মধ্যে টিমের রাশিয়া গিয়ে চুক্তিটা চূড়ান্ত করা দরকার।”

মন্ত্রী নির্দেশ দিলেন

-“সামারী তৈরী করেন, ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১২ আমরা রাশিয়া যাবো”।

সামারী তৈরা করা হলো। হাতে হাতে সার-সংক্ষেপ অনুমোদন করে আনার জন্য মন্ত্রী মহোদয়কে অনুরোধ করা হলো তিনি রাজি হলেন না। ক্যাবিনেট মিটিং সোমবার, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিবকে ধরলাম। সে আমাকে রক্ষা করলো। সরকারী আদেশ জারী করলাম। টিকেট বুক করতে হবে, টাকা দিয়ে কিনতে হবে ডেলিগেটদের দৈনিক ভাতা, হোটেল ভাড়া দিতে হবে। অর্থের সংস্থান নাই। প্রকল্পে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এখনও পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের নিজস্ব আয় তহবিল হতে কর্জ্জ নিয়ে কোন রকমে সামাল দিলাম

সিনিয়র সহকারী সচিব ফিরোজকে টিমের সংগে নেয়া হল। ইন্টারনেট থেকে মস্কো আবহাওয়ার পূর্বাভাষ ডাউন লোড করে এনে দিলো। পূর্বাভাষ অনুযায়ী তাপমাত্রা মাইনাস-৩ ডিগ্রী থেকে মাইনাস-১০ ডিগ্রী থাকবে। গতরাতে বিশ্ব আবহাওয়ার গতি প্রকৃতি দেখছিলাম। উত্তরের বাতাস গতি পথ পরিবর্তন করেছে। বাতাস উত্তর-দক্ষিণ মুখি হবে। এটা হলে তাপমাত্রা মাইনাস দশ থাকবে না। আরও নীচে নামবে। তাঁকে বললাম;

-‘‘যদি মাইনাস ১০ থাকে ভাগ্য ভালো। আমার বিশ্বাস আরো নীচে নামবে। মাইনাস বিশও হতে পারে।’’

ওভারকোট পুলওভার কোনটাই নাই। মাইনাস দশ হোক আর বিশ হোক। বাহিরে যেতে হলে গাড়ী লাগবে সংগে একজন যে মস্কো চেনে। আমার চেনা মস্কো অনেকদিন আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। কোনটাই নাই। নিজে ভেজিটেরিয়ান, মাছ-মাংস ছাড়া খাবার পাওয়া প্রায় অসম্ভব। গত মাসে প্যারিস গিয়েছিলাম। পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান সাহেব একটা রাইস কুকার, চাল, ডাল, আলু নিয়ে গিয়েছিলেন। প্যারিসে খিচুড়ি আর আলু ভর্তা খেয়েছি। ভাবলাম এ রকম একটা ব্যবস্থা করলে কেমন হয়। ফিরোজ বললো; একটা বড় রাইস কুকার পেলে সে সব কিছু ব্যবস্থা করবে। তিন বছর আগে মেয়ের বিয়েতে তিনটা রাইস কুকার দিয়েছে। মেয়ে এ গুলো নিয়ে যায় নি। ফিরোজকে বাসায় এসে একটা নিয়ে যেতে বললাম। বাসায় এসে কুকারটা নিয়ে জাবে আমার বউয়ের সাথে শলাপরামর্শও করলো। বউ যত্ন করে ব্যাগে চাল, ডাল, কাটা গাজর, ফুলকপি, পেয়াজ, আলু প্যাকেট করে দিলো। ফিরোজ বঙ্গ বাজার থেকে আমার জন্য ওভার কোট কিনেছে। বিজয় দিবসে ভোরবেলা ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে আসলাম। প্রোটোকল অফিসার ব্যাগ চেক-ইন করে দিয়েছে। রাশিয়ান ফেডারেশনের দূতের ডেপুটি আমাদের বিদায় জানাতে এয়ারপোর্টে এসেছেন।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিদেশ যাবেন। বিজয় দিবসের প্যারাসুট ডইভিং চলছে। যাত্রা এক ঘন্টা বিলম্বিত হবে। রওয়ানা দেয়ার আগেই জানানো হলো; এক ঘন্টা দেরীতে রওয়ানা দিলাম। মাঝ পথে আবারও জানানো হলো; উড়োজাহাজ যথাসময়ে ছেড়ে যাবে। গানম্যানকে বললাম,

-‘‘ আলমগীর উল্টোপাল্টা পথে হলেও আগের টাইমেই পৌঁছাতে হবে।’’

চালক, গানম্যান চেষ্টা করে তদবীর করে আগের সময়ের পনের মিনিট আগেই পৌঁছালে। ডিসপ্লেকার্ডে লিখা সময় , অনেক আগেই তা পার হয়েছে। কোন খবর নাই। ঘন্টা খানেকের কিছু সময় পরে বিমান ছাড়লো। সাড়ে চার ঘন্টা উড়ে দুবাই পৌঁছলাম। দুবাই এর তাপমাত্রা বাইশ ডিগ্রী সেলসিয়াস। তিন ঘন্টা পরে আমিরাতের অন্য একটা বিমানে মস্কো রওয়ানা দিলাম। সাড়ে চারঘন্টা আকাশে, মস্কো বিমান বন্দরে নামলাম। মস্কো দূতাবাসের কর্মকর্তারা আমাদের নিয়ে ভিআইপিতে বসলেন। ভিআইপি রুমের হিটিং মনে হলো চৈত্র মাস। জানালা খোলার চেষ্টা করে পারা গেল না। শেষে দরজাটা খুলে কোনমতে চৈত্রে বৈশাখ আনার চেষ্টা করলাম।

পার্কিং এ গাড়ী, সেখানে যেতে হবে। ব্যাগ থেকে ওভার কোটটা বাহির করে গায়ে চাপালাম। টের পাচ্ছি মাইনাস বাইশ ডিগ্রী কি জিনিস। গাড়ীতে উঠেই যাত্রীরা রব তুললো,

-‘‘হিটার, হিটার--------’’

জবাবে জানানো হলো;

-“হিটার চালু করা হয়েছে গরম হতে সময় লাগবে।” হোটেল আতিয়ানায় পৌঁছলাম। গরমে ঘুমানো যাচ্ছে না। একটা জানালা খুলে দিলাম।

ঘুম থেকে উঠে দেখি সূর্য উঠেনি। চারিদিক অন্ধকার। সাওয়ার নিয়ে নাস্তা করতে নামলাম। নাস্তার ব্যবস্থা মোটামুটি ভালো। ঘন্টা খানেক ধরে নাস্তা করলাম। ১১.০০ টায় মস্কো আর্ট গ্যালারী, চার্চ ভ্যাসিলি দেখে বাসায় ফিরবো। পথে একটা ম্যাকে’ দপুরের খাবার। আমাদের হারাম হালাল বিষয়গুলো ভাবতে হয়। এ ভাবনা তাড়িত হয়ে বেশীর ভাগ কর্মকর্তা ফিশ বার্গার অর্ডার দিলেন। ভেজিটেবল কোন আইটেম নাই। একটা বিগ ফ্রেঞ্চ ফ্রাই দিয়েপুরের খাবার সারলাম। হোটেলে ফিরে লবিতে আড্ডা। মাইনাস বাইশ ডিগ্রী সেলসিয়াস, সব কিছু জমে যাওয়ার অবস্থা। মুখ, চোখ, মাথা সব কিছুই ঢাকা। তবুও সবাই ছবি তুলবে। লবিতে এ নিয়ে একা একা হাসছি।

বিদ্যুৎ সচিব মনোয়ার জিজ্ঞাস করলো;

-‘‘হাসছিস যে?’’ জবাবে আবারো হেসে বললাম;

-‘‘ না এমনি’’ সে বললো;

-‘‘কি অদ্ভুত ব্যাপার ঠান্ডা দেশে এসে রুমে গরমে জান যায় যায়।’’

-‘‘জানালাটা খুলে দিলেই পারিস।’’ উপদেশ দিলাম

-‘‘তাই করতে হবে। গতকাল সাহস করতে পারিনি।’’

মাইনাস বাইশ ডিগ্রী সেলসিয়াস থেকে এসেছি। ভিতরের যন্ত্রপাতি জমে আছে, কফির অর্ডার দিলাম। কফি খেয়ে রুমে। সদ্য তোলা ছবিগুলো দিল্লিতে পিএসএর কাছে আর ঢাকায় পাঠালাম। কিছুক্ষণ টিভিটা ব্রাউজ করে গা গড়া।

হোটেলের ফোনটা বেজে উঠলো;

-‘‘গুড ইভিনিং, স্যার।’’ ফিরোজের গলা।

-‘‘আপনাদের জন্য চারট আলু ভর্তা খিচুড়ি করা হয়েছে। খেয়ে নিন। ৪০৭ নম্বর চেয়ারম্যান স্যারের রুমে

প্যান্ট গেঞ্জি গায়েই ছিলো। একটা পুলওভার চাপিয়ে ৪০৭ নম্বর রুমের দিকে রওয়ানা দিলাম। ছয় তল হোটেলের ৬০৩ নম্বর রুমে আমার অবস্থান। খিচুড়ি, ডিম ও আলু সিদ্ধ দিয়ে ভর্তা। কেউ খাচ্ছেন, কেউ খাওয়া শেষ করেছেন; মাঝে বাঙ্গালীর আড্ডা। ফিরোজ বললো;

-‘‘স্যার একটা আকাম হয়ে গেছে। রাইস কুকারটা ভেঙ্গে গেছে। ভাবীকে কি জবাব দিবো।’’

-‘‘কোন জবাব দিতে হবে না। কুকার ভেঙ্গে গেলে এত সব কি দিয়ে করলা?’’ জানতে চাইলাম;

-‘‘ভেঙ্গে গেলেও কাজ চলছে। চেয়ারম্যান সাহেবও ছোট একটা কুকার এনেছেন। তা দিয়ে ভালোই হয়েছে।’’

খাওয়া, আড্ডা শেষে রাধুনীদের ধন্যবাদ দিয়ে লবিতে ফিরলাম। আগামীকাল স্পাসকি এর সঙ্গে দেখা করার প্রোগ্রাম ছিল। অ্যামবাসি জানালো,

-‘‘দেখা হবে না।’’

আমরা ঠিক করলাম, ক্রেমলিন ঘুরবো, ফেরার পথে পানি খাওয়ার জন্য কিছু কিনে আনবো। মাইনাস বাইশ ডিগ্রী সেলসিয়াসে বাতাস। সহ্য করার নয়। বেশীক্ষণ ভালো লাগলো না। ক্রেমলিন, ক্যাথেড্রা ইভান দেখে, ছবি তুলে রাস্তায় গাড়ীর জন্য অপেক্ষা করছি। জমে যাওয়ার অবস্থা। হাতে কোন গ্লাবস ছিল না; ছিল না কোন টুপি। তবুও একমাত্র আমিই ভালো ছিলাম। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মাসুদ সাহেবের অবস্থা দেখে খারাপ লাগলো। তাকেঁ লাফা লাফি করতে বললাম। গাড়ী আসলো। আমরা একটা দোকাথেকে নি, খাবার কিনে হোটেল তাতিয়ানায় ফিরলাম। জানলাম, বিকাল ৩.০০ টায় স্পাসকি আমাদের সাথে দেখা করবেন।

তাতিয়ানা বুফেতে দপুরের খাবার সারলাম। আমাদের সাথে যোগ দিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাননীয় প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান এবং বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান জনাব এস.এ. সামাদ স্যারদ্বয় টমেটো খিরার সালাত কয়েকটা লেটু পাতা, আলু ভাজি দিয়ে পেটটাকে শান্তনা দিলাম। গুনতে হলো ৯০০ রুবল রাশিয়ার মুদ্র, যা বাংলাদেশের তিন হাজার টাকা। একটা কফি খেয়ে রেষ্টুরেন্ট ছাড়লাম। লবিতে অপেক্ষা করছি। অ্যামবাসির লোকজন গাড়ী নিয়ে হোটেলে পৌঁছলেন। স্পাসকি এর সাথে আলোচনার জন্য রাশিয়ান ফেডারেশনের অর্থ মন্ত্রণালয়ে পৌঁছলাম। কথা ছিল মাত্র ১২ জন ভিতরে বসবে। রবীন্দ্রনাথ, ফিরোজ, শৌকতকে বাহিরে বসতে বলেছিলাম। রুমে চেয়ার আছে দেখে তাদেরও ডেকে পাঠালাম।

ক্লো রুমে ওভার কোট মাফলার রেখে, মিটিং রুমে ঢুকলামটেবিলের উপর পানি আর কুকি রাখা আছে। নিজেরা নিজেদের আপ্যায়িত করে অপেক্ষা করছি। স্পাসকি এর লোকজন এসে পৌছেছে। কিছুক্ষণ পর স্পাসকি আসলেন। তিনি আমাদের প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের ঘনিষ্ঠ। বুকে বুক মিলিয়ে মুখোমুখি বসে শুভেচ্ছা বক্তব্যের পর টিমের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। স্পাসকির পর আমাদের দলনেতা পরিচয় পর্ব সারলেন।

সৌজন্য সাক্ষাৎকার, কিছু কথাবার্তর পর বিদায় নিলাম। স্পাসকির কথাবার্তায় সর্তকবাণী ছিল। বলা হলো, আমরা মূল কাজের জন্য পিড়াপিড়ি করলে আলোচনা ফলপ্রসু নাও হতে পারে। তাতিয়ানায় ফিরলাম। আলুভর্তা ডাল ভাত খেয়ে লরিতে আড্ডা। আগামীকাল মূল নিগোশিয়েশন। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, লেজেসলেটিভ বিভাগের সচিবও টিমে যোগ দিয়েছেন। অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নাজমুস সাকিব, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্ম-সচিব মাহমুদা এর সংগে টুকটাক কথাবার্তা সেরে রুমে ফিরলাম।

মাননীয় প্রতিমন্ত্রী আবেগ নিংগড়ানো ভাষায় তার সহযোগীতা চাইলেন। সে কিছু সর্তক বানী শোনালেন, উপদেশ দিলেন। আমরা বিদায় নিলাম। রাতে আবারো ৪০৭ নম্বর রুমে খিচুড়ি আলু ভর্তা দিয়ে আড্ডা। আইন সচিব ইতোমধ্যে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছেন। তিনি একটা চুটকি শোনালেন। আপনারাও শুনুন;

-“একজন খুনের আসামী। তার জামিন হচ্ছে না। তার পরিবারের লোকজন উকিল সাহেবকে ধরলো”। যে করেই হোক জামিন করে দিতে হবে। উকিল সাহেবও জজ সাহেবকে ধরলেন।

-“স্যার এই লোকটাকে জামিন দিতেই হবে।” জবাবে জজ সাহেব বললেন;

-“জামিন দিবো কোন ধারায়, বলুন।” জবাবে উকিল বললেন;

-“কেন স্যার, আসামীর অশ্রুধারা, আপনার করুনাধারা”।

আড্ডা শেষ করে আমরা বিদায় নিলাম। আগামীকাল থেকে মূল নিগোশিয়েশন শুরু হবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব রাতে এসে টিমের সাথে যোগ দিলেন। তাঁকে আনার জন্য গাড়ী পাঠাতে বলেছি। লবি থেকে সবাই বিদায় নিয়েছে। আমিও বিদায় নিলাম।

বিদেশে সরকারী কর্মকর্তাগণ যান, তাঁরা ভিআইপি। এছাড়াও আছেন বাংলাদেশের খেটে খাওয়া মানুষ। ভাষা না জানায় তাঁদের বন্দী জীবন। হঠাৎ করে কোন বাংগালী পেলে আবেগ প্রবণ হয়ে যায়। কথা বলতে চায়। কথা বলার অনুসংগ হিসাবে কিছু খাওয়াতে চায়। তাদের গায়ে সিমেন্ট, বালি, নোংরা রং কাদা মাটি। কোট টাই পরা ভিআইপিদের তাদের এই আদিখ্যেতা পছন্দ হয় না। এ নিয়ে অনেক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। চেয়ারম্যান সাহেব এমন এক ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তিনি ঘটনাটি আমাদের কাছে বর্ণনা করেন। এটা আমাদের কাছে জীবন্ত জোক হিসাবে মুখে মুখে ঘুরতো কোন কিছু বলার দরকার নাই। শুধু “কুকখ্যা” বললেই ঘটনাটি বলা হয়ে যেত। ঘটনাটি শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে, শুনুন।

অষ্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতে সরকারী কাজে বাংলাদেশ থেকে দুই জন ভিআইপি গেছেন। একটা রেস্তরায় নাস্তা খাচ্ছেন, বাংলায় গল্প করছেন। এ সময় ভিয়েনায় খেটে খাওয়া দু’জন বাংগালী ঢুকে। তাদের কথা শুনে কথা বলতে ইচ্ছে করে। তারা কোকা কোলা বলে না। বলে ‘কুক’। কথা বলার জন্য তারা ভিআইপিদ্বয়কে কোক অফার করে। তারা খেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। কিন্তু তারা নাছোড়বান্দা। এক পর্যায়ে তারা বলে ফেলে,

-“জানো আমরা কে? আমরা ভিআইপি।” শুনে শ্রমিকদ্বয় ক্ষেপে যায়। ক্ষোভে ফেঁটে পড়ে, বলে;

-“তুই কিসের ভিআইপি। ক’টাকা দিয়েছিস দেশকে? আমি পাঁচ কোটি টাকা দিয়েছি ‘কুক খা’।” জবাবে ভিআইপিদ্বয় বলে,

-“আমরা কোক খাইনা।” শুনে তাঁরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে বলে,

-ভিআইপিরা কুক বেশী খায়। শালা ‘কুক খা’।

মূল আলোচনা ১৯-২০-২১ ডিসেম্বর, ২০১৩। সকালে নাস্তা খেয়ে রুশ ফেডারেশনের অর্থ মন্ত্রণালয়ের দিকে রওনা দিলাম। ৩০ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম। ক্লোক রুমে ওভার কোট, টুপি, মালফার জমা দিয়ে টোকেন নিয়ে কনফারেন্স রুমে বসলাম। বিশাল একটা রুম, কনফারেন্স টেবিল, এক পাশে বসের বিশাল চেয়ার। রুমের দেয়ালে লটকানো রাশিয়ান অর্থমন্ত্রীদের ছবি। এক পাশে জার আমলের অন্য পাশে সাম্প্রতিক মন্ত্রীদের ছবি। সামনা সামনি আলোচনা হবে। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ও টিম লিডার মাঝা মাঝি বসলেন। টিম লিডারের পাশে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব আবুল কালাম আজাদ, রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত, বিদ্যুৎ সচিব, অন্য পাশে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য লেজিসলেটিভ সচিব ও আমি। বাকিরা দু’পাশে ভাগ করে বসলো।

রাশিয়ান ডেলিগেশনের লোকজন আসতে শুরু করেছে। কথা হলো। দু’পক্ষের মাঝে সেতু বন্ধন হিসাবে কাজ করছে। ফিরোজ, রবীন্দ্রনাথ, প্রকল্প পরিচালক শৌকত। রাশিয়ান ফেডারেশনের এ্যাকটিং অর্থমন্ত্রী আসলেন। সৌজন্য বিনিময় হলো। উভয় পক্ষ ডেলিগেটদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। আলোচনা শুরু হলো।

রাশিয়ান ফেডারেশন প্রিকন্সট্রাকশন অংশের জন্য অর্থায়নের লক্ষ্যে চুক্তির খসড়া প্রস্তাব করেছে। পাল্টা আমরা ইন্টারগর্ভামেন্টাল চুক্তি এবং গত টিমের সংগে স্বাক্ষরিত এগ্রিট মিনিটসের ভিত্তিতে একক একটি চুক্তির প্রস্তাব করেছি।

রাশিয়ান পক্ষ আলাদা চুক্তি করার যুক্তি তুলে ধরলেন। বাংলাদেশের পক্ষে ইআরডি এর সচিব আমাদের যুক্তি তুলে ধরলেন। রাশিয়ান পক্ষ প্রস্তাব করলো। আলাদা চুক্তি করলেও তারা মূল নির্মাণ কাজের অর্থায়নের জন্য একটি সমঝোতা স্বারক সাক্ষর করতে রাজি আছে। বাংলাদেশ পক্ষ বিবেচনা করলে তাঁরা তাঁদের প্রস্তাবিত সুদের হার ৪.৫% কে কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করবে।

অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব পাশে বসা ছিলো। তাঁকে দিয়ে আজাদ ভাইকে একটা চিরকুট পাঠালাম।

-“আমরা রাজি হতে পারি। সুদের হার কমানোর বিষয়টা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”

আজাদ ভাই রাশিয়ান পক্ষের কাছ থেকে প্রস্তাব চাইলেন। ৪.০% প্রস্তাব করে জানালো পেব্যাক পিরিওড কমানো হলে সুদের হার আরো কমানো যাবে। রাশিয়া ওইসিডি এর সদস্য পদ পেয়েছে। তাদের ক্রেডিট রেটিং খুব খারাপ। ওইসিডি চায় রাশিয়া ক্রেডিট রেটিং ভালো করুক। অন্তত একটা ‘এ’ তাঁদের দরকার। চিরকুট দিলাম।

-“ফিক্সড রেইট কমানোর ম্যান্ডেট এ্যাকটিং মিনিস্টারের বেশী নাই। অন্য দিকে ভাসমান হারে তার ক্ষমতা অনেক তাঁকে আমার লিবারেল মনে হয়েছে। কথাবার্তা বলে দেখবেন।”

আজাদ ভাই রাশিয়ান পক্ষকে ভাসমান দর হার প্রস্তাব ছাড়লেন। রাশিয়ান পক্ষ প্রিকন্সট্রাকশন পর্বের পাঁচশত মিলিয়নের জন্য লিবর যোগ ১.৫০% প্রস্তাব করলো। লিবর শব্দ সংক্ষেপ এল দিয়ে লন্ডন, আই দিয়ে ইন্টার, বি তে ব্যাংক, ও দিয়ে অপারেশন এবং আর হলো রেট। বর্তমানে এ লিবর ০.৫৩%, এটা কমছে, খুব তাড়াতাড়ি বাড়বে বলে মনে হয় না। তাই ভাসমান হার নিয়ে কচলানো ভালো মনে হলো। এক সময় লিবর ৬০% উঠেছিল, তাই একটা সর্বোচ্চ লিমিট বাঁধারও প্রয়োজন আছে, যাকে অর্থ বিভাগ ক্যাপ নামে ডাকে। যুক্তি পালটা যুক্তি দিয়ে ঠিক হলে লিবর যোগ ১.০০% বর্ধিত সময় কালসহ পরিশোধের মোট সময়কাল ১৫ বছর। সাকিবকে এই হারে গ্রান্ট এলিমেন্ট হিসাব করতে বললাম। সে সেলে অর্থ বিভাগকে হিসাবটা করে জানাতে বললো। পাঁচ মিনিটের মধ্যে জানানো হলো প্রায় ১৮%। আমরা রাজি হলাম।

কথা হলো, রাশিয়া ১ম ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া এবং প্রিকন্সট্রাকশন অর্থায়ন সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের প্রাথমিক খসড়া রাতে মেইলে দিবে। আগামীকাল ১ম অংশের চুক্তিতে অনুসাক্ষর এবং সমঝোতা স্মারকের শর্তাদি নিয়ে আলোচনা হবে। আন্তরিক সোহার্দপূর্ণ আলোচনা ও ফলাফল নিয়ে আমরা সবাই খুশি। অর্থমন্ত্রণালয় ছেড়ে বিদায় নিলাম। টিম লিডার ও প্রতিমন্ত্রী মহোদয় হোটেলে ফিরলেন। আমরা একটা ম্যাকে ডুকলাম। বড় আলু ভাজি আর কোক দিয়ে দূপুরের খাবার শেষে হোটেলে ফিরলাম। চেয়ারম্যান সাহেবের রুমে রাতের খাওয়া আড্ডা প্রায় শেষ। তখনও মেইলে খসড়াগুলো আসেনি। দূতাবাসকে ফোন করা হলো। তারা জানালো;

-“আমরাও পাইনি।”

এগারোটার দিকে খসড়া দু’টো পাওয়া গেল। সাকিব ও মাহমুদা বসলো। আমরা আমাদের মতামত চূড়ান্ত করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিবকে জানালাম।সকাল বেলা নাস্তা শেষে আবারও অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রিকন্সট্রাকশন পর্বের চুক্তির খসড়ায় তাঁরা আলোচনার বাহিরে কিছু শব্দ যোগ করেছে। আমরা তুলে ধরলাম। তাঁরা রাজি হলো। মনে হলো তাঁরা আমাদের বাজিয়ে দেখতে চেয়ে ছিল।

মূল নির্মাণ কাজের অর্থায়ন নিয়ে নিগোশিয়েশন শুরু হলো। ইআরডি এর সচিব আজও আলোচনার লিড দিচ্ছেন। বড় সম্মেলন কক্ষ পাওয়া যায়নি। নিচে ছোট্ট একটি কক্ষ। সব লোক বসা যাবে না তাই কিছু লোক হোটেলে থেকে গেছেন। রুমটা ঠান্ডা। গরম কাপড় নিয়ে ভিতরে থাকা যায় না। ঠান্ডায় সবাই কাঁপছি। কর্তৃকক্ষকে জানানো হলো, তাঁরা একটা রুম হিটার যন্ত্র করে চালু করলেন।

এ্যাকটিং মিনিস্টার আসলেন, কুশল বিনিময়ের পর আলোচনা শুরু হলো। বেশ কিছু বিষয়ে আরো আলোচনা প্রয়োজন। পরের দিন আলোচনা করে অন্য বিষয়গুলো চূড়ান্ত করার কথা হলো। হোটেল ফিরে রেস্তোরায় দূপুরের খাবার সারলাম। কিছু বাজার সওদা দরকার। মাইনাস ২২ ডিগ্রীতে খাবার দোকানের খোঁজে লেজিসলেটিভ সচিব। সাকিব ও ফিরোজ কে নিয়ে বাহির হলাম। কিছুদূর গিয়ে একটা মানিচেঞ্জে গিয়ে ডলার ভাংগিয়ে রুবল করা হলো। খাবার দোকান খুঁজছি পাচ্ছি না। হঠাৎ ধপাস করে শব্দ হলো। পিছন ফিরে দেখি লেজেসলেটিভ সচিব, বরফে পিছলা খেয়ে মাটিতে পড়ে গেছে। সাকিব ধরে তুললেন। ভয় পেলাম। হোটেলে ফিরে আসার প্রস্তাব করলাম। লেজিসলেটিভ সচিব সহিদ জানালো;

-“কোন অসুবিধা নাই। তেমন লাগে নি।”

অভয় পেয়ে খুঁজা-খুঁজি চালিয়ে গেলাম। শেষ পর্যন্ত একটা দোকান আবিস্কার করলাম। মাটির তলায় ফুলকপি, ডিম, পানি কিনে হোটেলে ফিরলাম। সহিদকে প্যারাসিটামল খেয়ে নিতে বললাম। রাতে রান্না-বান্না শেষে খাওয়ার পর আড্ডা দিয়ে রুমে ফিরলাম। ২২ ডিসেম্বর, আবারও গেলাম অর্থ মন্ত্রণালয়ে। বড় কনফারেন্স রুমে বসলাম। এ্যাকটিং মিটিস্টার আসলেন। আলোচনা শুরু হলো। নিগোশিয়েশনের এক পর্যায়ে রাশিয়ান পক্ষ প্রস্তাব করলে লিবর যোগ ২.০%, ক্যাপ সর্বোচ্চ ৪.০% পরিশোধ কাল ৩৮ বছর। সাকিব হিসাব করে বললো।

-“গ্রান্ড এলিমেন্ট প্রায় ৪০%।” আরো জানালো;

-“এটা খুব ভালো ডিল। আমরা রাজি হতে পারি।” আমরা রাজি হলাম। রাশিয়ান পক্ষ জানালো,

-“আধা ঘন্টার মধ্যে চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক চুড়ান্ত হবে। আমরা আজই অনুসাক্ষর করতে পারবো।”

রাশিয়ানরা চলে গেল। আমরা অপেক্ষা করছি। দুই ঘন্টা পর খসড়া পাওয়া গেল। সাকিব, মাহমুদাকে নিয়ে খসড়াগুলো দেখলাম। ছোট কয়েকটি টাইপের ভুল ছিলো। ঠিক করা হলো। প্রিকন্সট্রাকশন এর জন্য ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তি এবং কন্সট্রাকশন ফেইজের অর্থায়নের জন্য সমঝোতা স্মারক চুড়ান্ত হলো। দুই টিম লিডার স্বাক্ষর করে হস্তান্তর করলেন। ছবি তোলা হলো, আমরা হাসি মুখে বিদায় নিলাম।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তাদের সাথে কারিগরি বিষয়ে “রোসাটম” এবং এটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট। বিকাল ৩.০০টা বাজে। এটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট এর সাথে আলোচনার জন্য রওনা দিলাম। সাথে চেয়ারম্যান পরমাণু শক্তি কমিশন, যুগ্ম সচিব রবীন্দ্রনাথ, প্রকল্প পরিচালক শৌকত এবং ফিরোজ। প্রতিমন্ত্রী মহোদয়, টিম লিডার হোটেলে ফিরলেন। অন্যরা একটা মাইক্রোবাসে খাবারের সন্ধানে। আমরা আলোচনার জন্য অফিসে।

গেইটে আমাদের রিসিভ করলেন একজন কর্মকর্তা। তিনি আমাদের পরিচিত। ক্যাতেরিনা দোভাষীর কাজ করছে। সে আগেও বাংলাদেশ গেছে। প্রথমেই নিয়ে গেল ডাইনিং টেবিলে। খাওয়া শেষে আলোচনা। ধারণা করেছিলাম কুমানী বা সাখারভ দু’জনের একজন আলোচনার সুত্রপাত করবেন। অন্য একজন আলোচনা শুরু করলেন। পরিচয় পর্ব শেষে তাঁরা জানতে চাইলো,

-“কে রুপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট এর বাস্তবায়নকারী হিসাবে কাজ করবে?” জবাবে জানালাম;

-“কেন? বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন।” মনে হলো জবাবে তাঁরা সন্তোষ্ঠ হতে পারে নি। তাঁরা পাল্টা প্রশ্ন করলো;

-“তোমাদের একাউন্টস অফিস আছে? আমাদের টাকা দিবে কে?” তোমাদের একটা কোম্পানী করতে হবে। জবাবে জানালাম,

-“তোমাদের এ নিয়ে ভাবতে হবে না। আমাদের সব কিছু আছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর কাজ শুরু হলে তোমাদের টাকা পেতে অসুবিধা হবে না।” এবার আমি বললাম;

-“কাজ শুরু করার জন্য টিপিপি তৈরী করতে হবে। এতে প্রতিটি কাজের নাম, বর্ণনা, বিশেষজ্ঞ সংখ্যা,

প্রাক্কলিত ব্যয় এবং সময় কাল উল্লেখ খাকবে। এগুলো আমাদের জানা নাই। রাশিয়ার সহযোগীতা দরকার।” আমাকে অবাক করে তাঁরা জবাব দিলো;

-“আমরা ৪ বারে চারটি চুক্তি ছাড়া কিছুই দিতে পারবো না।” রাশিয়ান ফেডারেশনে বাংলাদেশের

মাণ্যবর রাষ্ট্রদূত জনাব সাইফুল ইসলাম। রাশিয়ায় পড়াশুনা করেছেন। অনর্গল রাশান বলতে পারেন। রাশান ভাষায় বিষয়টা তাঁকে বুঝাতে অনুরোধ করলাম। তেমন লাভ হলো না। বললাম,

-“এ বিষয়ে আমরা লিখিতভাবে জানাবো”। আলোচনা শেষ হলো। তারা একটা সম্মত কার্যবিবরণী সাক্ষর করার জন্য প্রস্তাব করলো। জানালাম,

-“আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখবো।” আলোচনা শেষে হোটেল এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

রাতে ডাল ভাত, আড্ডা শেষে ঘুমাতে গেলাম। কোন গাড়ী থাকবে না। সকাল বেলা কোন প্রোগ্রাম নাই। বিকালে বাংলাদেশ এ্যামবাসীতে বিজয় দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠান। ৫-০০ টায় গাড়ী নিয়ে দূতাবাসের লোকজন আসলো। আমরা রওনা দিলাম। প্রোগ্রাম শুরু হবে ৭-০০ টায়। এখনও ঘন্টা দেড়েক বাকি। আমরা রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনায় বসলাম।

আলোচনা শেষে অনুষ্ঠানে গেলাম। সামাদ স্যার প্রধান অতিথি, প্রতিমন্ত্রী মহোদয় বিশেষ অতিথি, রাষ্ট্রদূত সভাপতি। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রীর শুভেচ্ছা বাণী পড়ে শুনানো হলো। সামাদ স্যার, প্রতিমন্ত্রী মহোদয় মুক্তিযুদ্দের স্মৃতিচারন করবেন। অনুষ্ঠান শেষ হলো। প্রবাসীদের পক্ষ হতে কোন বক্তব্য ছিল না। আমরা উপরে গেলাম খেতে।আমাকে দেখে এ্যামবাসেডর পত্নী হাসলেন। তাঁর কাছে হাসির কারণ জানতে চাইলাম। বুঝলাম কিছু একটা ঘটেছে। এ্যামবাসাডর পত্নী জানালেন,

-“মন্ত্রী মহোদয় আপনাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন।”মন্ত্রী মহোদয় জানালেন,

-“এ্যাকটিং মন্ত্রী বলছেন, ভয়ংকর শীত। আর আপনি হাত মোজা, টুপি ছাড়া, হাড়, কান, মাথা খোলা রেখে মাইনাস বাইশকে ব্যাড্যাগিরি দেখাছেন। তাই একটা কবিতা লিখেছি। উনাকে কবিতা পড়ে শুনালাম। তাই হাসছেন।”

আমি অট্টো হাসিতে ফেটে পড়লাম । আমাদেরকেও শুনাতে অনুরোধ করলাম। তিনি অনুরোধ রাখলেন। ছড়াটা সুন্দর হয়েছে। অনুষ্ঠানে মন্ত্রী মহোদয় ও টিম লিডারকে ফুলের তোড়া দেয়া হয়েছে। তারা ফুলগুলো আমাদের দিয়ে গেলেন। আমরা কি করবো? একটা বিয়ে হচ্ছিল। বৌকে ফুলগুলো নিয়ে পাঠালাম। তারা আমাদের হাত নেড়ে বিদায় দিলো।

লেজিসলেটিভ সচিব ২২ তারিখ রাতে বিদায় নিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ও শৌকত বিকাল পাঁচটায় বিদায় হলো। আমরা রয়ে গেছি। আমাদের ফ্লাইট ২৪ ডিসেম্বর বিকালে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সিনিয়র সচিব এর একান্ত সচিব মাসুম পাটওয়ারী, বিদ্যুৎ সচিব সাকিব, মাহমুদা আগে মস্কো আসেনি। তারা মস্কোর ঘন্টা দেখতে চায়। বিদ্যুৎ সচিবকে বললাম।

-“ঘন্টাটা না দেখে গেলে, লোকে বলবে, ঘন্টাটাও দেখে আসিস নি, তা হলে কি করলি।”

“বুঝেছি। ঠিক আছে দেখিস। তাঁকে আশ্বস্ত করলাম।”

ঘন্টা দেখার জন্য গাড়ী ঠিক করলাম। সকালে ঘন্টা ধরে নাস্তা করলাম। ১১-০০ টায় মস্কোর ঘন্টা দেখতে বাহির হলাম। তাপ মাত্রা মাইনাস ২৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস। মাসুম পাটওয়ারী পাতলা মোজা, হালকা জুতা পরে বাহির হয়েছে। তাকে নিয়ে আমার ভয় হলো। টিকিট কাউন্টার খুঁজতে উপর নিচ করে জমে গেলাম। শেষ পর্যন্ত টিকিট কাটা হলো। ক্রেমলিনে ঢুকলাম। মস্কোর ঘন্টার দিকে হাঁটছি। হঠাৎ দেখি মাসুম পাটওয়ারী নাই। ঠান্ডায় হাতের একটা আংগুল বেঁকে গেছে। কয়েকটা ছবি তুলে একটা দোকানে ঢুকলাম।

সবার সাথে যোগাযোগ করে বাহির হলাম। গাড়ী নিয়ে সোজা তাতিয়ানায়। ডাল ভাত খেয়ে রুমে গেলাম। বিকালে কাছের একটা দোকানে গেলাম পানি কিনতে। রাতে শব্জি খিচুড়ি খেয়ে তাতিয়ানায় আমাদের উনুনে পানি ঢাললাম। সকাল বেলা নাস্তা, গোছগাছ, চেক আউট, আগেই ভাড়া পরিশোধ করা ছিল, প্রতিরাত্রি সাত হাজার রুবল, মিনিবার ব্যবহার করিনি, সহজেই চেক আউট হলো। আমরা মস্কো এয়ারপোর্টে এসে বিজনেস ক্লাস লাউঞ্জে হালকা খেয়ে নিলাম।

৫-০০ টায় দুবাই এর পথে যাত্রা, সাড়ে চার ঘন্টা পর দুবাই নামলাম। যাত্রা বিরতিতে বাসা ও অফিসের জন্য চকলেট কিনলাম। সকালে ঢাকার পথে দুবাই ছাড়লাম। সাড়ে চার ঘন্টা আকাশে কাটিয়ে ঢাকা হজরত শাহজালাল বিমান বন্দর। তখন সকাল সাড়ে দশটা। ভিআইপিতে লাগেজ এর জন্য অপেক্ষা করছি। সবার মনে প্রশান্তি। আমরা মস্কো গেছিলাম, পরমাণু বিদ্যুৎ এর প্রত্যাশা নিয়ে। আশার আলো নিয়ে ফিরে এসেছি।