শিক্ষা সফর

Category: Education Written by Md. Rafiqul Islam Hits: 4345

 

আরশাদ হোসেন এনডিসি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটারের মহাপরিচালক। থিয়েটারটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার শক্তিশালীকরণ নামের একটা প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। প্রকল্পে স্টাডি ট্যুর এর ব্যবস্থা আছে। মহাপরিচালক চান তাঁর প্রকল্পের ট্যুরে আমি যাই। তিনি জানালেন,

-অনেক দিন বিদেশ যাননি, স্যার। আমাদের সাথে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিংগাপুরে ঘুরে আসবেন। মহাপরিচালক প্রস্তাব করলেন। জবাবে বললাম;

-আমি সবে মাত্র এ মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেছি, এত লম্বা সময় দেশের বাইরে থাকা ঠিক হবে না

-স্যার না করবেন না। আরশাদের অনুযোগ।

 

জনাব আরশাদ হোসেন, যুগ্ম-সচিব। গ্রুপ-৭৭ হিসাবে আমাদের সাথে সচিবালয় ক্যাডারে শাখা প্রধান হিসাবে ১৯৮৪ সালে চাকুরীতে যোগদান করেছিল। সে বয়সে কনিষ্ঠদের মধ্যে একজন। শাখা প্রধানের কেরানী মার্কা কাজ তারপর ভুত ভবিষ্যত নাই। আরশাদ ১৯৮৪ সালে আবারো বিসিএস দিলো। কর ক্যাডারে চাকুরী নিয়ে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলো। বয়সে খুব কম হলেও অল্প কয়েক দিনেই তার সাথে গাঢ়ো একটা সম্পর্ক তৈরী হয়ে গেছিল। আমাদের মাঝে সম্পর্ক তুই। শাখা প্রধান নাম পরিবর্তন হয়ে সহকারী সচিব হয়েছে। সে সহকারী সচিবের পদ থেকে বিদায় নিলেও আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিতে পারেনি। সুখে দু:খে সে আমাদের সাথেই ছিল। না করতে পারলাম না।

-ঠিক আছে। প্রস্তাব নিয়ে আসেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন হলে যাবো

প্রস্তাব আসলো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করলেন। সরকারী আদেশ জারী হলো। প্রকল্প হতে ট্রেনিং এবং টেকনোলোজি ট্রান্সফার সংক্ষেপে টি.টি.টি কে নিয়োজিত করা হয়েছে। টিটিটি আমাদের সাথে আলোচনা করে দিনক্ষণ ঠিক করলো। ১১ অক্টোবর-১২ সিংগাপুর এয়ার লাইন্সের বিমানে সিংগাপুর হয়ে টোকিও, ১৬ তারিখ টোকিও থেকে সিউল, ১৯ তারিখ সিউল থেকে সিংগাপুর আসবো। ২৪ তারিখ সিংগাপুর হয়ে ঢাকায় ফিরবো।

টিটিটি জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ভিসা, টিকিট ও দৈনিক ভাতা বাবদ ডলার দিয়ে গেল। সংগে একটা ব্যাগ সাথে ইনফরমেশন নোট। সরকারী কর্মকর্তাদের বিমানবন্দরে সিংগাপুরে অনএরাইভাল ভিসা দেয়া হয়।

রাত ১১.৫৫ মিনিটে ফ্লাইট। প্রোটোকল অফিসার সন্ধ্যা ৭.০০ টায় ব্যাগ নিয়ে গেছে, সাথে পাসপোর্ট ও টিকেট। ব্যাগ চেক-ইন, বোর্ডিং, পাস, ইমিগ্রেসন চেকিং করে রাখবে। আমি ৯.০০ টার দিকে যাবো। আমি খালি হাতে চলাচল করি। কোন হ্যান্ড ব্যাগেজ সাথে রাখি না। রাত ১০.৩০ মিনিটে ড্রাইভার আপেলগানম্যান আলমগীরকে নিয়ে বিমান বন্দরে ভিআইপি লাউঞ্চে পৌঁছলাম

আরশাদ, আইএমইডি এর মহাপরিচালক সালমা, নভোথিয়েটারের নায়মা আগেই এসে অপেক্ষা করছে। সালমা, নায়মাকে বিদায় জানাতে তাদের স্বামীদ্বয়ও উপস্থিত। কফি, আড্ডা, কিছু করণীয় বিষয় বলে সময় পার করলাম। সিংগাপুর এয়ারের একজন কর্মকর্তাকে ডাক দিলেন। আমরা বিমানে উঠলাম।

আমি বিজনেস ক্লাসের যাত্রি, তাই ওদের হতে আলাদা হয়ে গেছি। আকাশে চার ঘণ্টা কাটলো। আমরা সিংগাপুর বিমান বন্দরে পৌঁছলাম। সিংগাপুর সময় সকাল ৬.০০ টা। টোকিও এর উদ্দেশ্যে রওনা দিবো ৯ টা ২৫ মিনিটে। আমরা আছি ১ নম্বর টারমিনালে, টোকিও এর বিমান ছাড়বে ৩ নম্বর টারমিনাল হতে। আমাদের ৩ নম্বর টারমিনালে যেতে হবে। সিংগাপুরস্থ বাংলাদেশ দুতাবাসকে জানানো হয়েছিল। ওখান থেকে প্রটোকল অফিসার এসেছেন। তাঁকে নিয়ে আমরা এলাম টারমিনাল ট্রান্সফার পয়েন্টে। সেখান থেকে ২ নম্বর টারমিনাল, ট্রেন পরির্তন করে ৩ নম্বর টারমিনালে পৌঁছলাম। আমি খালি হাত হলেও মহিলা দুজন প্রতিনিধির হাত ব্যাগের সাইজ ও ওজন দুটোই বেশ। দতাবাসের প্রতিনিধি না থাকলে অসুবিধায় পড়তাম। ৩ নম্বর টারমিনালে ঢুকে আমাদের গেইটে অন্য তিন জনকে রেখে বিজনেস লাউঞ্চে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে এক কাপ কফি খেয়ে গেইটে ফিরলাম। সকাল ৯.০০ টায় বোর্ডিং চেক ইন করে উড়োজাহাজে ঢুকলাম। ৭ ঘণ্টার ফ্লাইট, যাত্রা শেষ হয় না। শুয়ে, বসে, হাটাহাটি করে সময় কাটালাম। উড়োজাহাজ টোকিও বিমান বন্দরে পৌঁছলো।

ইমিগ্রেশন পার হয়ে ব্যাগ নিয়ে বিমান বন্দর হতে বাহির হলাম। টিটিটি নিয়োজিত জাপানী গাইড শেবিতা তোমিয়ে হাতে নভোথিয়েটার, বাংলাদেশ লিখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাড়িয়ে আছে। সত্তর এর কাছাকাছি বয়স, কর্মঠ এক ভদ্র মহিলা, মোটামুটি ভালো ইংরেজী জানেন। কুশল বিনিময় হলো। আরশাদকে সাথে নিয়ে তিনি গেলেন সেল ফোন সংগ্রহ করতে। দুটো সেল নিয়ে তারা ফিরলেন। শিবাতা একটা মাইক্রো এনেছেন। আমরা মাল-সামান নিয়ে মাইক্রোতে উঠলাম। মাইক্রো রওনা দিল এটিএস সেন্টারে। সেখানেই আমরা জাপানে কটা দিন-রাত কাটাবো।

রুমে উঠলাম। আকারে একেবারে ছোট। একটা টেলিফোন এবং টেলিভিশন আছে। নীচে ক্যান্টিনে নাস্তা এবং রাতের খাবার। রবিবার বন্ধ, ঐ দিন আমাদের বাহিরে খেতে হবে।

১৩ অক্টোবর ঘুম থেকে উঠে নয়টায় হামালিন স্পেস সাইন্স সেন্টার রওনা দিলাম। সংগে শেবিতা । মাইক্রো চলছে, আমরা একটা বড় নদী পার হচ্ছি। শেবিতা জানালেন;

-দেখ আমরা সুমিতা নদী পার হচ্ছি। এটা টোকিও এর সবচেয়ে বড় নদী। নদীর পাড় দিয়ে রাস্তা চেরি গাছের সারি। চেরি পাতাগুলো হলুদ হতে শুরু করেছে। পানি টলটলে নীল। সুমিতাকে হলদে পাড় নীল শাড়ী পরা ষোড়শীর মত দেখাচ্ছে। সাথে সাথে জীর্ণ শীর্ণ গন্ধ ভরা শীতলক্ষা, বুড়িগংগা চোখে ভেসে উঠলো। শেবিতা বললেন;

-১৯৬৪ এর টোকিও অলিম্পিক এর সময় বড় বড় রাস্তা তৈরী করার জন্য নদীগুলোকে ঢেকে দেয়া হয়েছে। তাই বলে নদীগুলোকে মেরে ফেলা হয়নি। নদীর প্রবাহ আগের মতই আছে। পানিও আগের মতই স্বচ্ছশেবিতার কথা শুনতে শুনতে হামালিন সেন্টারে পৌঁছলাম।

ঢুকতেই একটা সুভেনির এর দোকান। আমরা দোকানে দাড়ালাম, শেবিতা টিকিট কাটলেন। হাজার হাজার জাপানী বাচ্চাদের কিচির মিচির। শিবাতা জানালেন;

-প্রতিটি স্কুলকে বাধ্যতামূলক ভাবে বছরে ৪ দিন ছাত্রদের এ ধরনের বিজ্ঞান কেন্দ্রগুলোতে আনতে হয়।

বাচ্চাগুলো প্রতিটা আইটেম নিয়ে খেলছে, দেখছে। আমরাও দেখলাম। সেন্টারের পাশে একটা কেএফসিতে গেলাম। মাছ, মাংস খাই না। দু প্যাকেট ফ্রেঞ্চ ফ্রাই মানে আলু ভাজি খেয়ে ছবি দেখতে গেলাম।

হলটা পুরাতন, আমাদের বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটারের মতই। ছবি দেখে সেন্টারে ফিরলাম। এখান থেকে সনি সেন্টারে গেলাম। এখানেও নানা শিক্ষার আইটেম। শেষে একটা ৩ডি ছবি দেখলাম।

১৪ অক্টোবর কাটলো তারামকুতো সাইন্স সেন্টারে। সব কিছু হামালিনের মত। রাতে গোতু এর সৌজন্যে একটি ঐতিহ্যবাহী জাপানী রেষ্টুরেন্টে খেতে গেলাম। সাকির সাথে চোখের সামনে রান্না করা খাবার; উপভোগ করার মত।

পরের দিন ডিসনি ল্যান্ডে কাটালাম। লক্ষ লক্ষ লোক এসে জমা হয়েছে ডিসনি ল্যান্ডে। সবগুলো হলিউড ছবির চরিত্রকে এখানে জীবন্ত করে রাখা হয়েছে। মিকি মাউস, সিনডেরিলা, বিপদ সংকুল রেল, বোট শেষে বর্নাঢ্য প্যারাড উপভোগ করলাম। প্যারাডে সবগুলো হলিউড এবং কার্টুন চরিত্র মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে সেন্টারে পৌঁছলাম।

১৬ অক্টোবর, আজ নারিতা হয়ে সিউলের নচেন আসবো। কথা ছিলো, ডিসনি ল্যান্ড দেখেছি। আজ যতটুকু পারা যায় ডিসনি সি দেখবো। শেবিতা বললেন,

-যে সময় আছে তাতে ডিসনি সি এর কিছুই দেখা যাবে না

ভাবলাম, জাপান আসলাম রাজপ্রাসাদ দেখা হয়নি। আমরা একটা মেরিন এ্যাকুরিয়াম করতে চাই। একটা ্যাকুরিয়াম দেখে ধারণা নিয়ে গেলে ভালো হয়। ভাবনাটা জানালাম। শেবিতা বললেন;

-টোকিও মেরিন এ্যাকুরিয়াম একটা পার্ককে। পার্কটা সুন্দর। আমরা গাড়ীতে করে রাজপ্রাসাদ চক্কর দিয়ে টোকিও মেরিন এ্যাকুরিয়াম এ যাবো। সেখান থেকে একটা খাবার দোকানে, তারপর নারিতা

আমি প্রস্তাবে সাড়া দিলাম। আমাদের গাড়ীটা প্রাসাদ ঘুরে এলো। আহামরি তেমন কিছু নয়। টোকিও মেরিন পার্কে গেলাম। একটা বিশাল চক্র ঘুরছে, মানুষ গুলোকে দেখা যায় না। বিশাল পার্ক, একটা ট্রেন গাড়ী করে পার্কটা পাড়ি দিয়ে এ্যাকুরিয়াম এ ঢুকলাম।

পরিচালকের সাথে কথা হলো, তিনি জানালেন;

-“ প্রতিদিন স্কুলের অনেক ছেলে-মেয়ে আসে, তবুও খরচের ৩০% উঠে না। সরকার বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য ভুর্তকী দেয়।” আরো বললেন;

-তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, স্রোত সৃষ্টি, পানি পরিশোধন, খাবার ব্যবস্থাপনা এক জটিল, কষ্টকর ও ব্যয় সাধ্য কাজ। এ্যাকুরিয়াম করার আগে, সকলের বিষয়গুলো ভেবে দেখা দরকার

তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম। পথে একটা রেষ্টুরেন্টে বুফে খাবার খেয়ে সোজা নারিতা।

সন্ধ্যা ৭.০০ টায় কোরিও বিমানে নারিতা ছাড়লাম। বিমান প্রায় এক ঘণ্টা দেরীতে ছাড়লো। রাত সাড়ে ১০.০০ টায় ইনচেন, সিউল পৌঁছলাম। ভ্রমণটা আরামদায়ক ছিল না। বিমানবন্দরে সুং চান কংগ অপেক্ষা করছিলেন। সংগে কৈইকার একজন কর্মকর্তা; সুন্দরী ললনা। আরশাদ টিটিটি এর প্রতিনিধিকে নিয়ে সেল ফোন সেট আনতে গেল। সুং তেমন ভালো ইংরেজী জানেন না। টিটিটি এর সংগে তার যোগাযোগে ফাঁক ছিল। এ থেকে ভুল বুঝাবুঝি। ২টা সেল ফোন নিয়ে আরশাদ ফিরে হতাশা ব্যক্ত করলো;

-বুঝেছি, কোরিয়ার দিনগুলো ভালো যাবে না

একটা মাঝারি আকারের বাসে আমরা ৪ জন রওনা দিলাম। আমাদের জন্য সিউল রেসিডেন্সে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রুমগুলো অনেক বড়। রান্না বাড়ার সব ব্যবস্থা আছে। সুং একটা পাকিস্তানির দোকান থেকে হালাল খাবারের প্যাকেট দিয়েছে। খাবারের চিন্তা নাই। কোরিয়ানদের পানি নিয়ে বড়াই অনেক দিনের। পানির চিন্তাও ছিলো না। ঘুম দিলাম।

১৭ অক্টোবর সকালে গাইএয়েনবক প্রাসাদ, সেখান থেকে সিউল ন্যাশনাল সাইন্স মিউজিয়াম দেখলাম। অপূর্ব সব আয়োজন। প্রতিটি জায়গায় পুতুলের মত কোরিয়ান পুতুলগুলোর কিচমিচ। বিকালে সংগম বিজ্ঞান সেন্টার গেলাম। ব্যক্তি মালিকানার পাহাড়ের গায়ে তৈরী একটা কেন্দ্র। নীচে বিজ্ঞান মেলা পরিদর্শন, তারপর ক্যাবেল কারে পাহাড়ের উপর অবজারভেটরিয়ামে। টেলিস্কোপে ভেগা দেখলাম। পাহাড়ে লাল, হলুদ, সবুজের সমারহ।

প্রকৃতি কোরিয়া কে দুহাত ভরে দিয়েছে। কোরিয়ানরাও প্রকৃতির জন্য কম করেনি। প্রকৃতিকে রক্ষা করছে অকৃত্রিম রূপে।১৮ অক্টোবর গুয়াচেয়ন প্রাসাদ দেখে সিউল সাইন্স মিউজিয়াম গেলাম। মিউজিয়াম গুলো ছাত্র ছাত্রীদের পদচারণায় মুখরিত। প্রতিটি ইভেন্ট একটি ক্লাস রুম।

টিটিটি এর তথ্য অনুযায়ী তাপমাত্রা থাকার কথা ২১-২২ ডিগ্রী সেলসিয়াস। দেমে গেলো দশের নীচে নান্দায়েমাম বাজারে মজা করা গেল না। বিশাল রাস্তা কোন গাড়ী ঘোড়া নাই। মাঝ খানে কিছু দোকান হাজার হাজার মানুষের স্রোত। দরদাম করে কিনতে হয়। আরশাদ শীত সহ্য করতে পারে না। সিউলে এক বংগ ললনার দোকান খুজে পাওয়া গেল। সেখান থেকে সে একটা মাফলার আর টুপি কিনলো।

কোরিয়ান খাবার আমরা খেতে পারছি না দেখে আমাদের কো-অর্ডিনেটর পাকিস্তানীর একটি রেস্ট্ররেন্টে নিয়ে গেলেন। তার বউ কোরিয়ান, সে পাকিস্তানী তবে হোটেলে চলে ভারতীয় মিউজিক, পরিবেশিত হয় ভারতীয় খাবার। পাকিস্তানী বলতে একমাত্র উপাদান হালাল।

ডাল আর সব্জি রান্না দিয়ে রুটি খেয়ে বেশ চাংগা বোধ করছি। পথে একটি গ্রোসারী শপে কয়েকজন বংগ সন্তানের সাথে দেখা হলো। কথাবার্তা বলে তাদের শুভ কামনা করে বিদায় নিলাম।

১৯শে অক্টোবর এন সিউল টাওয়ার দেখতে গেলাম। পাহাড়ের চূড়ায় একটা বিশাল স্থাপনা তার উপর টাওয়ার। পাহাড়ের মাঝপথ পর্যন্ত গাড়ী চলেবাকী পথ হেটে উঠতে হ। সালমা অসুস্থ, উঠতে পারবে না তাই সেখানেই রয়ে গেল। আমরা চারজন উপরে উঠলাম। পৃথিবীর দ্রুততম লিফটে উপরে উঠে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। কয়েকটা সুভেনির কিনে নীচে নামলাম।

দুপুরে হান নদীতে ফেরী ভ্রমণ। হান নদীটিও সুমিতার মতই ভর যৌবনা, পাড় দিয়ে রাস্তা। ফেরিতে ছোট ছোট পুতুলের মত বাচ্চারা উঠলো। আমি বাচ্চাগুলোর সাথে নাচলাম। ফেরিতে এক কাপ কাপেচিনো খেলাম

সিউলে আমাদের শেষ কয়েকটি ঘণ্টা। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে আমরা সিউল ছেড়ে যাবো। কো-অর্ডিনেটর শেষ বারের মত আমাদের সেই পাকিস্তানী রেস্তরাতে নিয়ে গেলেন। খাওয়া দাওয়া শেষে ইনচেন এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সংগে বাসা থেকে প্রাকৃতিক ভাবে উৎপাদিত আপেল এনে ছিলেন। কেটে খাওয়ালেন। তাঁর আন্তরিকতা আর আপেলের স্বাদ ভুলবো না।

আমাদের বিদায় জানাতে কৈয়কা এর সেই সুন্দরী এসেছিলেন। তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ইমিগ্রেশন শেষ করে উড়োজাহাজে উঠলাম। সাত ঘণ্টা আকাশে কাটিয়ে মধ্যরাত ১.০০ টায় সিংগাপুর পৌঁলাম

বিমানবন্দরে টিটিটি এর প্রতিনিধি আমির হামজা, ইন্টারপ্রেটরসহ গাড়ী নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ দূতাবাসের ৩ জন প্রোটকল আমাদের বিমানবন্দরে সাহায্য করতে এসেছেন। তাদের সহায়তায় বিমানবন্দর পার হয়ে তাদের বিদায় দিয়ে আমির হামজার সাথে সেরানন রোডে মোস্তফা সেন্টারের উল্টো দিকে ক্লারেমন্ট হোটেলে উঠলাম। জানালাহীন ছোট একটা রুম দম বন্ধ হওয়ার যোগাড়। ক্লান্ত সবাই ঘুম দিলাম। সকালে নাস্তা শেষে মোস্তফা সেন্টার চক্কর দিয়ে আসলাম।

মাসুম আমার শ্যালক স্ট্যান্ডার্ড চ্যাটার্ড ব্যাংকে সিংগাপুরে চাকুরী করে। তার নিজের একটা ফ্লাট আছে। তার ওখানে উঠতে পারতাম। আমি দলনেতা তাই যানি। সিংগাপুর এসে থাকলাম; সে জানলো না; পরে রাগ করবে তাই টেলিফোন করলাম। দুপুর বারোটার দিকে সে এলো।

ফখরুদ্দীনের হোটেলে মাসুম আমাদের খাওয়ালো। সে দিন বিকালে আমরা গেলাম মাসুমের ফ্লাটে দাওয়াত খেতে। তার সুবাদে সিংগাপুরে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বাস ও আন্ডারগ্রাউন্ডে চড়া হলো। অনেক আয়োজন। তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে ট্যাক্সিতে হোটেলে ফিরলাম।

২১ শে অক্টোবর আমরা মেরিনা বে এর সিংগাপুর সাইন্স মিউজিয়াম গেলাম। স্থাপত্য শিল্পের অনন্য কৃর্তি ম্যারিনা বে, এর মধ্যেই এই মিউজিয়াম। বাহির থেকে কাজিনো, হোটেল, সুইমিংপুল ইনফিনিটি পুল দেখে মিউজিয়ামে ঢুকলাম। জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পর সিংগাপুরের মিউজিয়ামে তেমন আকর্ষণ করে না। বিকালে মোস্তফা সেন্টারে ঘুরা-ঘুরি করে ফখরু্দ্দীন এর হোটেলে খেয়ে ঘুম দিলাম।

আরশাদ, সালমা চেকআপ করাবে; সংগে নায়মাও গেল মাউন্ট এলিজাবেত হাসপাতালে। আমি মোস্তফা সেন্টার পরে মাসুমকে নিয়ে ছেলের জন্য ২ গিগা বাইটের মুভেবল হার্ডডিস্ক কেনার জন্য বাহির হলাম। আরচার্ড প্লাজার কাছে একটা ইলেকট্রনিক্স মার্কেট থেকে মাসুম ছোট বোনের ছেলের জন্য ল্যাপটপ; আমি ছেলের জন্য মুভেবল হার্ডডিক্স কিনে হোটেলে ফিরলাম।

সন্ধ্যা ৬.০০ টায় নাইট সাফারী একটা গাড়ীতে করে চিড়িয়াখানা ঘুরে আসা। এক ঘণ্টা মত সময় লাগে। চিড়িয়াখানার প্রায় সবজন্তুকে ছেড়ে দেয়া আছে। ছবি তোলার সময় ফ্লাস জ্বললে জন্তুগুলোর চোখে আলো পড়ে। এতে এরা ক্ষুব্ধ হয়। তাই চালক বারবার বলছেন;

-দয়া করে ফ্লাস ব্যবহার করবেন না

কে শোনে কার কথা। ফ্লাস জ্বলতেই থাকলো। আমরা নাইট সাফারী শেষে গেলাম ফায়ার শো দেখতে। মুখে কেরসিন নিয়ে জ্বলন্ত আগুনে তেল ছুড়ে আগুনের কুন্ডলী বানানো। দর্শকদের সম্পৃক্ত করে অনুষ্ঠানটিকে বেশ উপভোগ্য করে তুলেছেন। শেষে এনিম্যাল শো দেখতে গেলাম। দর্শকদের মাঝে সাপ ছেড়ে দিয়ে, দর্শকদের ঘাড়ে সাপ দিয়ে এরা অনুষ্ঠানটিকে উপভোগ্য করে তুলেছে

সালমা, নায়মা সাপকে ভীষণ ভয় পায়। প্রথমে তারা যেতে রাজি হননি। পরে গেলেন, বসলেন আমার আর আরশাদের মাঝ খানে। নায়মা সারাক্ষণ সালমাকে জড়িয়ে ধরে ছিল। উপস্থাপনা এবং দর্শক সম্পৃক্ততা ছাড়া অনুষ্ঠানটার তেমন কোন আকর্ষণ ছিল না। অনুষ্ঠান শেষে হোটেলে এসে ফখরুদ্দীনের হোটেলে গিয়ে হতাশ হলাম। খাওয়া শেষ, পাশের বাংগালী হোটেলে খেয়ে হোটেলে ফিরলাম। খাওয়াটা তেমন উপভোগ্য ছিল না।

নায়মা সমানে কিনছে। তাকে জানালাম,

-নায়মা আপনার মোট লাগেজ ২০ কেজির বেশী হলে ভাড়া দিতে হবে। নায়মা চুপচাপ, কোন কথা বললো না। তাই বলে কেনা বাদ দিলো না। আরশাদও কম যায় না।

২৩শে অক্টোবর সালমা রিপোর্ট দেখাবে ঔষধ কিনবে। নায়মাকে নিয়ে সে মাউন্ট এলিজাবেত গেল। আমি আর আরশাদ কিছুক্ষণ আড্ডা কিছুক্ষণ মোস্তফা সেন্টারে ঘুরাঘুরি করে ফখরুদ্দীনের হোটেলে খেয়ে হোটেলে ফিরলাম। বিকালে হোটেল থেকে সেনতোজা। বিকালে প্রথমেই ঢুকলাম ওয়াটার ওয়ার্লড এ। এটা আসলে মেরিন ন্যাকুরিয়াম। সমুদ্রের সব বিস্ময়কে তুলে ধরা আছে এখানে। পাশে ডলফিন ও উদের খেলাও দেখলাম।

ওয়াটার ওয়ার্ল্ড থেকে বাহির হয়ে স্কাই ট্রেনে পৌঁছালাম ইউনিভারসাল স্টুডিও, সেখানে কয়েকটা ছবি তুলে গেলাম লেজার শো দেখতে।অভিনেতা, অভিনেত্রী, দর্শক, লেজার বিম, পানির ফোয়ারা, ফায়ার ওয়ার্ক সবকিছু একাকার করে সেনতোজা এক অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। সেনতোজা থেকে বিদায় নিলাম।

মাইক্রো চলছে, ফিরে গেলাম ৮ সালে, প্রথম সেনতোজা আসি। একটা দ্বীপ, ফেরিতে পৌঁছলাম। তেমন কিছুই ছিল না। একটা জেলে পল্লী মনে হয়েছিল। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লিলাভূমি। দ্বিতীয়বার গেলাম ক্যাবেল কারে। এখন সেনতোজা দ্বীপ নয়, সিংগাপুর মেইন ল্যান্ড।

২৪শে অক্টোবর হোটেল হতে চেক আউট করে গেলাম সিন নদীর পাড়ে। সেনতোজার সিংগটা বিশাল। মূল নদীর তীরের সিংগ দুটো আকারে বড় না; তবে আকর্ষণীয়। মুখ দিয়ে ঝরণার মত পানি বাহির হচ্ছে। বাতাসে আমাদের মুখ ভিজে গেল। বাহিরে বেশ গরম, খুব আরাম পেলাম।

সালমা ওজি এর দোকান হতে সার্ট কিনবে। আমরা ছিলাম লিটল বাংলাদেশে, পাশেরটাই ছিল লিটল ইন্ডিয়া। কথা ছিল লিটল চাইনা দেখবো। বাদ দিলাম, ওজি শপে গেলাম; সালমা তাঁর ছেলের জন্য শার্ট কিনলো। আরশাদও যোগ দিল।সিংগাপুর চক্কর দিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছলাম। ভিতরে ঢুকলাম, কিছুক্ষণ পর মাসুম এসে যোগ দিল। আমরা ট্যাক্সির জন্য দাড়ালাম। আমার টা ম্যানুয়ালী করা গেল না। কারণ আমার মালামাল লাগেজে চলে যাবে। কম্পিউটার থেকে কাগজ তৈরী করলাম।

‘স্টারবাক’ এর দোকানে বসলাম। এটা একটা কফিশপ। মাসুম কফি খাওয়ালো। তারা সবাই ক্লোড কফি খেল। আমি ব্লাক কফি খেয়ে ব্যাগেজ চেক-ইন করতে গেলাম। তিন জনের ব্যাগের ওজন প্রাপ্যতার চেয়ে বেশী। মাসুম চালাকি করে সিংগাপুর এয়ারের একজনকে বললো;

-“ ইনারা সব বাংলাদেশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাঁরা এক সংগে লাগেজ চেক-ইন করতে চায়।”

ভদ্র মহিলা হেঁসে বিজনেস ক্লাসে তাঁদের এনে আমার সংগে চেক-ইন করে দিলেন। লাগেজে অগ্রাধিকার ব্যাচও লাগানো হলো। সিংগাপুর এয়ারের একটা বিমানে উঠলাম সন্ধ্যা ৮.০০ টায়। বিমানবন্দর হতে অনেক গুলো চকলেট কিনলাম। ৪ ঘণ্টা আকাশে থেকে রাত ১০.৪৫ মিনিটে বিমান ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামলাম।

পিএস, প্রটোকল অফিসার পাসপোর্টে সীল ছাপ্পর দিয়ে নিয়ে আসলো। লাগেজ এসেছে। ড্রাইবার আপেল গানম্যান আলমগীরও সংগে আছে। আমরা রওনা দিলাম। ভীষণ ক্লান্ত।