আজ ঈদুল আযহা! মৃত্যুর মত বিষয় নিয়ে লিখা শুরু করবো ভাবিনি। ক’টা ঘটনা আমাকে মৃত্যু নিয়ে কলম ধরতে বাধ্য করেছে। মৃত্যু ভাবনা নতুন নয়, প্রায়ই ভাবি। ইদানিং এ ভাবনাটা আমাকে একটু বেশী করে পেয়ে বসেছে। ভাবনাটা মনের গভীরে রেখে দিতে পারলে ভালো হতো। পারিনা, মাঝে মধ্যে প্রকাশ পেয়ে যায়।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের বাংলা গভনেট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক, বাংলাদেশ সরকারের যুগ্ন-সচিব হজ্জে যাচ্ছেন। সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য এসেছেন। তদবির করার সুযোগ আমি সাধারনত দিই না। হজ্জের ছুটি আগেই মঞ্জুর করেছি।

প্রকল্প পরিচালক ময়েন উদ্দিন বললেন;

-‘‘স্যার হজ্জে যাচ্ছি, দোয়া করবেন।’’ হাঁসতে হাঁসতে বললাম;

-‘‘আমার জন্যও একটা দোয়া করতে বলবো। করবেন কিনা, আগেই কথা দিতে হবে।’’ ময়েন চালাক মানুষ! তার উপর আমলা, আমলার মতই জবাব দিলেন;

-‘‘করার মত হলে অবশ্যই করবো, বলেন স্যার।’’

-‘‘খাস দিলে আল্লার ঘরে আল্লার কাছে আমার জন্য দোয়া করবেন; যেন তাড়াতাড়ি মারা যায়।’’ মায়েনকে অনুরোধ করলাম। মায়েন এটা আশা করেননি। অপ্রস্ত্তত হয়ে সামনে নিলেন।

-‘‘ভালো দোয়া সবসময় করা যায়, খারাপ দোয়া করা যায় না। আল্লার ঘরে তো নয়।’’ মায়েন জবাব দিলেন।

মায়েনকে দেশ ও মানুষের জন্য দোয়া করতে বললাম। সুস্থ ভাবে আমাদের মাঝে ফিরে আসার কামনা করে; মায়েনকে বিদেয় দিলাম।

মৃত্যু ভাবনা সারাক্ষন আমার সাথে রয়েছে। গাড়ীতে চলাফেরা করি। সড়ক দুর্ঘটনা ইদানিং বাড়াবাড়ী রকম বেঁড়ে গেছে। গাড়ীতে বসে একদিন খবরের কগজটায় চোখ বুলাছি। আগের দিন মানিকগঞ্জে সড়ক দূঘটনায় এটিএন এর মিশুক মনির সহ কয়েকজন মারা গেছেন। ঘটনার বিসত্মারিত বিবরণ পড়তে পড়তে মনে হলো, মিশুক মনিরদের মত প্রাণ চলে যায়, যারা দেশকে, জাতিকে অনেক কিছু দিতে পারতেন। হঠাৎ করে ড্রাইভার আমিনুলকে বলে বসলাম;

-‘‘সড়ক দূর্ঘটনায় এত লোক মারা যায়। আমিতো সারাক্ষন গাড়ীতে থাকি। আমি মরিনা কেন ?’’ আমিনুল অভিমান করে জবাব দিলেন;

-‘‘আপনি মারা গেলে ছেলেটার কি হবে ’’? জবাবে বললাম;

-‘‘আমার বাবাও তো ছোট বেলায় মারা গেছেন। তখন আমি সবেমাত্র চতুর্থ শ্রেণীতে।’’

আমিনুল নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। বললেন;

-‘‘আপনার বাবা জমিদারী রেখে গেছিলেন। আপনি আপনার ছেলের জন্য কি রেখে যাচ্ছেন।’’ জবাবে বললাম;

-‘‘কিছু রেখে যাচ্ছি না, এটা ঠিক নয়।’’

-‘‘সময় পালটে গেছে স্যার। বাবা মা থেকেও আজ কাল ছেলেমেয়ে মানুষ হয় না।’’

কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। জানালা দিয়ে রাস্তার দিকে চেয়ে রইলাম। রাস্তায় অনেকগুলো টোঁকাই। কারো হাতে ফুল, কেউ শুধুই ভিক্ষা চাইছে। বেঁচে থাকার জন্য কি আপ্রাণ চেষ্টা, কি প্রচন্ড আকুতি। আলমগীর, আমার গানম্যান; এতক্ষন চুপচাপ বসে ছিলেন। হঠাৎ মুখ খুললেন;

-‘‘স্যার এদের কিছু নাই। তারপরও বেঁচে থাকার জন্য কি না করছে। আপনাকে তো আল্লাহতায়লা অনেক কিছু দিয়েছেন। তারপরও মরতে চান কেন? ’’

জবাবে বললাম;

-‘‘এ তাঁর খেলা। জানি না আলমগীর।’’

চুপচাপ বসে আছি। কানে ভেসে আসছে,

-‘‘টাকা দেন স্যার, ভাত খাবো।’’

-‘‘টাকা দেন স্যার ঈদের জামা, বই কিনবো।’’

গাড়ীটা প্রতিদিনের মত কোলাহল পিছনে ফেলে চলে আসলো। কি হবে বেঁচে থেকে? এ প্রশ্ন মন থেকে ছেড়ে ফেলতে পারি না। আজকাল শরীরটাকে টানতে কষ্ট লাগে। বউ ছেলে মেয়েদের কাছেও চেপে রাখতে পারি না।

-‘‘আমি আর পারছি না বাবা। বেঁচে থাকার ইচ্ছাও আমার আর নেই। তোঁরা যা পারিস তাই কর।’’

শ্বাসত মৃত্যুকে তাঁরা মেনে নিতে পারে না। আমার উপর অভিমান করে। আমি আমার ‘‘ছেড়া ভাবনা’’ গুলোকে আমার ওয়েভ সাইটে লিখি। লিখা লিখির সুবাদে অনেক রাত অবধি, পড়াশুনা নিয়ে থাকি। ক’দিন থেকে শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। তাড়াতাড়ি বিছানায় গেলাম। ঘুমানোর চেষ্ঠা করছি। হঠাৎ সেলটা uঁবজে উঠলো। প্রথমে ধরতে চাইছিলাম না, পরে জরুরী কোন কিছু মনে করে ধরলাম। অপর প্রান্তে আমার একজন পাঠিকা সামিনার গলা। ক’দিন আগে তাঁর বাবা মারা গেছেন। আমিও ছোট বেলায় বাবাকে হারিয়েছি। আমার লিখায় তাঁর উল্লেখ আছে। সামিনা জানতে চাইলো;

-‘‘বাবা মারা গেছে আমাদের বলেছেন।’’ কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে আপনার অনুভুতিগুলো আমাদের জানাননি। জানালে আমরা বাবার মৃত্যুর শোকে শান্তনা খুজে পেতাম।’’

ব্লগে অনেক কমপ্লিমেন্ট, অনুরোধ, উপদেশ শুনেছি। এমন কোন অনুরোধ কোনদিন পাইনি। একটু অপ্রস্ত্তত হলাম। আমি তেমন কোন বড় মাপের লেখক নই, মৃত্যুকে নিয়ে লিখার সাহস আমার নাই। তাঁকে আমার অভিব্যক্তি ব্যাক্ত করলাম। পাঠিকা নাছোড়বান্দা। শেষমেস তাঁকে বললাম;

-‘‘তুমি মোপাঁসা পড়ো। তাঁর সব কিছু নিয়ে লেখার ক্ষমতা রয়েছে। তিনি তাঁর জীবনের এমন সব অনুভূতি নিয়ে লিখেছেন যা পড়লে আশা করি তোমাকে তৃপ্ত করবে।’’ জবাবে পাঠিকা বললেন;

-‘‘আমি পড়বো। তবে আপনার বাবার মৃত্যুর অনুভুতিটাও পড়তে চায়। আপনাকে ওটা লিখতেই হবে।’’

-‘‘যদি কোনদিন মোপাঁসার মতো বড় মানের লেখক হতে পারি অবশ্যই লিখবো।’’ পাঠিকাকে শান্তনা দিলাম।

পাঠিকার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে ঘুমানোর চেষ্ঠা করছি, সেলটা আবারও বেঁজে উঠলো। ধরতেই এক পাঠকের জিজ্ঞাসা;

-‘‘গণতন্ত্র ও সুশাসন: দিল্লীকা লাড্ডু পড়লাম। তাহলে আমরা কিসের পিছনে ছুটছি।’’ জবাব দিলাম;

-‘‘না ছুটলে কি করতাম ?’’ লাইনটা কেটে গেল, বাঁচলাম।

মৃত্যু নিয়ে লিখবো কোন দিন চিন্তাও করিনি। আমি গরুর রক্ত, জবাই করা সহ্য করতে পারি না। ঈদ-উল-আযহার দিন। গরু কোরবানী চলছে। তাই সারাদিন দরজা জানালা বন্ধ করে ঘরের মধ্যে শুয়ে আছি। কিছুক্ষন ওয়েব ব্রাউজ করলাম। এসএমএস গুলোর জবাব দেয়াও শেষ করেছি। সময় শেষ হয় না। ওয়েব ব্রাউজ করছি। টিভি থেকে আওয়াজ ভেসে আসছে। তাঁরা মিউজিক চ্যানেল, লাইভ গানের প্রোগ্রাম হচ্ছে। হৈমন্তি শুক্লা গাইছেন,

‘ চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে,

আমার করার কিছুই ছিল না।’

গানটা আমাকে ১৯৬২ সালের ৪ঠা আষাড়ে নিয়ে যায়। ধপধপে কাফনে ঢাকা বাবার শরীর। আমি আর হেরাস ভাই বাবার কবরে। আমাদের হাতে বাবার লাশ।

‘ চেয়ে চেয়ে দেখলাম বাবা চলে গেলেন,

আমার করার কিছুই নাই।’

কত লোক চলে যায়। কোন তারা খসে গেছে আকাশ কি এসব মনে রাখে। খসে যাওয়া তারার মত খসে যাওয়া মানুষ-গুলোকে আমরা কি মনে রাখি?। মানুষ মরে যায় কাঁদে শুধু তাঁরাই, যারা নির্ভরশীল। জীবিত নির্ভরশীলদের জন্য মৃত্যুটা বড় বেশী ভয়ংকর। নির্ভরশীলরা বুক ফেঁটে আর্তনাদ করে। বাবার লাশটা কবরে শুইয়ে দিয়ে পাটাতন বিছালাম। মাটি দিয়ে বাসায় এসে দেখি মা কাঁদতে কাঁদতে মুচ্ছা গেছেন। পাশের বাড়ীর কয়েকজন মহিলা মার মাথায় পানি ঢালছেন। বড় ভাই ইলিয়াস বাকরুদ্ধ, কাঁদতে কাঁদতে কখন নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। কিছুক্ষন পরপর শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। ছোট ভাই শফিক ডুকরে ডুকরে কাঁদছিল। আমাকে দেখে দৌড়ে এসে আমার বুকে মাথা রেখে ফুঁফরে ফুঁফরে কেঁদে উঠলো। জিজ্ঞাসা করলো;

-‘‘দাদা আমাদের কি হবে?’’ শান্তনা দিলাম,

-‘‘সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কোন চিন্তা করিস না।’’

শফিক অঝরে কাঁদছে। আমিনুলের এসব বোঝার শক্তি হয়নি। পাশের বাড়ীর এক মহিলার কোলে বসে আছে। সামনে বুবু অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। কে যেন মাথায় পানি ঢালছেন। আমিনুল ফ্যাল ফ্যাল করে সব কিছু দেখছে। এতদিন আমরা সবাই বাবার কাঁধে ছিলাম। কোন কষ্ট টের পাই নি। বাবার কষ্টও কোন দিন বুঝতে পারিনি। আজ আমরা সবাই বাবার জায়গায়; ভার লাগাছে। সইতে পারছি না। কাঁদছি; বাবা মুক্ত, বাবা স্বাধীন।

নিজেকে বড় একা মনে হলে। ভয় হতে লাগলো। একটা গানের কলি কোথায় যেন উকি দিল,

‘‘আমরা সবাই নবীণ মাঝি, হাল ধরছি,

ঝড়ের সাগর পাড়ি দিতে পারবো ?’’

একা হতে চেয়ে চাইলাম। বাবা, আমি এক ঘরে ঘুমাতাম। ঘরটা ফাঁকা। ঘরে ডুকলাম, সব কিছু আগের মতই আছে, শুধু বাবা নেই। নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না, বুকের যন্ত্রনা চোখ দিয়ে নিংড়ে বের হয়ে আসছে। বাবার জামা, পাঞ্জাবী, পাজামা সব কিছু যত্ন সহকারে আগের মতই আছে। বাবার এ স্মৃতিগুলো বার বার আমাকে বুলেট বিদ্ধ করছিলো। বাবার মুখটা আমার স্মৃতিতে ভেসে উঠছিল। এক সময় বিদ্রোহী হয়ে উঠলাম। হৈমন্তী শুক্লার গানের মত বাবাকে প্রশ্ন করলাম;

‘‘তুমি চলে গেলে, তা হলে স্মৃতি টুকু কেন রেখে গেলে?’’

এগুলো কেন নিয়ে গেলে না, বাবা?’’

বাবা কোন জবাব দিচ্ছেন না, বাবা হাঁসছেন। আবারও বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম;

-‘‘আমরা কাঁদছি। আমরা কষ্ট পাচ্ছি, তুমি হাঁসছো?’’

এবারোও কোন জবাব দিলেন না। স্মৃতিপট হতে তিনি হারিয়ে গেলেন। ক্লান্ত লাগছিলো। বিছানায় হেলান দিলাম। কখন ঘুমিয়ে গেছি বলতে পারবো না। হঠাৎ বাবার ডাকে ঘুম ভাংগলো;

-‘‘অবেলায় ঘুমাস না বাবা। শরীর খারাপ করবে।’’

-‘‘বাবা চলে যান নি। বাবা আছেন।’’ খুশিতে লাঁফ দিয়ে উঠলাম ! ‘‘বাবা তুমি?’’

এক প্রতিবেশী নির্বাক তাকিয়ে আছেন। কিছুক্ষন পর বললেন,

-‘‘যা হবার তা হয়ে গেছে। যিনি চলে যাওয়ার, তিনি চলে গেছেন। আর কোন দিন ফিরবেন না। আমাদের তো বেঁচে থাকতে হবে বাবা।’’

-‘‘হ্যাঁ ঠিক বলেছেন।’’ জবাব দিলাম।

হাত মুখ ধয়ে ভাই বোনগুলোকে নিয়ে খেতে বসলাম। গলাবন্ধ হয়ে গেছে। কারও খাওয়া হলো না। রাতে সবাই যার যার জায়গায় শুতে গেলাম। হেরাস ভাই এসে বললেন;

-‘‘এ ঘরে শু’বার দরকার নাই। অন্য ঘরে শুতে যা।’’

হেরাস ভাইকে বললাম;

-‘‘ভয় পাওয়ার কিছু নাই। আমি আমার জায়গায় শুবো।’’

-‘‘তুই যা ভালো মনে করিস ত্যাই কর। হ্যামি কিছু বুলবো না।’’ বলে চলে গেলেন।

সব কিছু আগের মত, বিছানাটায় বাবা নেই। বড্ড বেশী ফাঁকা ফাঁকা মনে হলো। গত রাতের সব কিছু আবারও স্মৃতিতে ভেসে উঠলো। বাবা কোর্টে গেছিলেন। যখন ফিরলেন তখন রাত ১১.০০ টা। শহর থেকে বাবা ফিরলেই আংগুর, আপেল, নাসপাতি নিয়ে আসেন। না খাওয়া পর্যন্ত শান্তি নাই। ঘুমাতে পারিনা। বাবার জন্য জেগে থাকি। আমি জেগে থাকি, তাই যেনে আজকাল মা বাবার জন্য অপেক্ষা করেন না। দরজা খোলাই ছিল। বাবা ঘরে ডুকলেন। হাতে আংগুর, আপেল, নাসপাতির ঠোংগা সহ ব্যাগটা দিলেন। সাথে সাথে একটা আংগুর বাহির করে মুখে দিলাম। বাবার সাবধান বাণী;

-‘‘না ধুয়ে খেয়ো না বাবা।’’

‘‘মাকে ডাকবো?’’ বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম;

-‘‘ভাত টেবিলে-দেয়া আছে কি ?। থাকলে দরকার নাই।’’ বাবা জবাব দিলেন;

ভাত টেবিলে দেয়া ছিল। তাই মাকে ডাকার প্রয়োজন হলো না। বাবা বললেন;

-‘‘তুই শুয়ে পড়! আমি ওজু করে নামাজ পড়ে, খেয়ে ঘুমিয়ে যাবো।’’

বাবা ওজু করতে বাড়ীর বাহিরে বাগানে গেলেন। হঠাৎ দৌড়ে এসে বললেন;

-‘‘দেখতো বাবা কিসে যেন খোঁচা লেগেছে।’’ পায়ের বুড়ো আংগুলটা হারিকেন এর আলোয় ভালো করে দেখলাম। খোঁচা নয় সাপে কামড় দিয়েছে।

‘‘সাপে কামড় দিয়েছে।’’ বলেই বারান্দায় শুকাতে দেয়া মায়ের শাড়ীর পাড় ছিঁড়ে তিনটা বাঁধ দিয়ে মাকে ডেকে হেরাস ভাইকে নিয়ে ওঁঝা ডাকতে গেলাম। পেলাম না। তিনি অন্য একটা রোগীকে দেখতে পাশের গাঁয়ে গেছেন। রাতে ফিরতে পারবেন না। বাড়ী ফিরে আসলাম। বাবাকে ঘর থেকে বাহির করে বারান্দায় মাটিতে রাখা হয়েছে। হাতের ইসারায় তিনি আমাকে ডাকলেন। আমি তাঁর কাছে গেলাম। আমার কানের কাছে মুখ রেখে বললেন,

-‘‘আমি যা বলছি শোন। কাঁদবি না। আমি চলে যাচ্ছি। নিজেরা যা কিছু করবি ভেবে চিন্তে করবি। কোন কাজ করে পসত্মাবি না।’’ কোন জবাব দিতে পারলাম না; ডুকরে কেঁদে উঠলাম।

সফদর মন্ডল বাবা কে জিজ্ঞাসা করলেন;

-‘‘চলে তো যাচ্ছো; এদের দেখবে কে?’’

সফদর মন্ডল হয়তো প্রত্যাশা করছিলেন, বাবা বলবেন, ‘তোরা তো আছিস ভাই। তোরা দেখিস’। বাবা তেমন কোন কিছুই করলেন না। হাতটাকে আকাশের দিকে তুলে কি যেন বুঝাতে চাইলেন। পারলেন না। হাতটা মাটিাতে পড়ে গেল। বাবা চলে গেলেন, করার কিছুই ছিল না।

কবর খুঁড়তে হবে, পাটাতনের জন্য বাঁশ কাটতে হবে, কাফনের কাপড় কিনতে হবে এসব চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়লাম। চারিদিকে আর্তনাদ, বুক ফাঁটা কাঁন্না। নিজের কাছে জানতে চাইলাম;

-‘‘আমাকে বলে দাও। আমি এখন কি করবো।’’ ইউনুস চাচার বাবা কাছে এসে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে নিজেও কাঁদছেন। আমি তাঁর কাছে জানতে চাইলাম;

-‘‘দাদা, এখন আমাকে কি করতে হবে?’’ জবাবে দাদা জানালেন;

-‘‘তোমরা ছোট্ তোমরা কি করবা ভাই। যা করার আমরাই করবো। তোমরা শুধু সবুর কর। আর বাবার জন্য দোয়া করো।’’

এরপর কি করে কখন সকাল হলো বলতে পারিনা। কান্না, চিৎকার ছাড়া কিছুই শোনা যায় না। খবর শুনেই জুম্মা মসজিদের ইমাম সাহেব আমাদের এখানেই ছিলেন। সকালে কবরের ব্যবস্থা করতে বলে ফজরের নামাজ আদায় করতে চলে গেলেন।

[

বাবাকে গোসল করানো হচ্ছে। শেষ গোসল। তাঁর আর কোনদিন গোসল করার প্রয়োজন হবে না। মুখ দিয়ে লালছে কষ ঝরছে। গায়ের চামড়া ফেঁটে গেছে। গোছল শেষে কাফন পড়ানো হলো। বাড়ীর বাহিরে আমগাছ তলায় জানাজার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাজার হাজার লোক। সামনে বাবার লাশ। ইমাম সাহেব জানাজা শুরুর আগে আমাকে ডাকলেন। কানে কানে বাবার হয়ে আমাকে সকলের কাছে মাফ চাইতে বললেন। বললেন প্রতিশ্রুতি দিতে, আমি বাবার হয়ে সকল দায় দেনা বহণ করবো।

ইমাম সাহেবের কথা মত আমি বাবার হয়ে ক্ষমা চাইলাম; বাবার সমস্ত দায় দেনা শোধ করার প্রতিশ্রুতি দিলাম। জানাজার আগে শেষ বারের মত বাবার মুখটা দেখলাম। মনে হলো বাবা হাঁসছেন। বলছেন;

‘‘আমি মুক্ত, আমি স্বাধীন। মৃত্যু আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছে। ভারমুক্ত করেছে। তোমাদের কাঁধে আমার বোঝ। তাই কাঁদছো ?’’

চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিল;

-‘‘আমি তোমার বোঝার ভারের জন্য কাঁদছি না। কাঁদছি তোমার রেখে যাওয়া স্মৃতির ভারে। তুমি এগুলো কেন রেখে গেলে ?’’

কোন জবাব পেলাম না। আজও কাঁদি, বাবার রেখে যাওয়া স্মৃতির ভারে।

 

Comments  

 
# shahina islam 2012-01-05 06:02
thanks & grateful to you. "BABA"-its mean everything to me.a great warrior,who saved me from all disaster."BABA"-lost but never forgotten.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
# maarric 2012-02-24 17:48
Like u i also feel my father who left me 2 years back. i remembered that whenever i faced troublesome situation in biz,my father stand with me and advise me accordingly, today he is not with me but i am in trouble by some odd & negative attitude people(service holder)................however, the odd day will go with Allah's blessing but the gap in me for my father never fill by other...........yes...."BABA"-lost but never forgotten.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
# maarric 2012-02-24 19:21
তদবির করার সুযোগ আমি সাধারনত দিই না..........is it true sir??? Bangladesh e..........salute u sir.....we respect u...........
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
# maarric 2012-02-24 19:29
We all have to left this world one day.............only remain our work through which people recall us always.....Sir,great writing.....it touch me much............
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh

All Articles

Calendar

< November 2011 >
Sat Sun Mon Tue Wed Thu Fri
      1 2 3 4
5 6 7 8 9 10 11
12 13 14 15 16 17 18
19 20 21 22 23 25
26 27 28 29 30